somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভালবাসার হাত বদল

০৮ ই আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :





ধবধবে সাদা বিশাল এক খন্ড বরফ।

নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ডুপ্লেক্স বাড়ীটাকে দুর থেকে দেখলে এমনই মনে হয়। তিনদিন আগে রং করা হয়েছে। দুধ সাদা রং। বাড়ীর দুপাশ দিয়ে দেখা যায় নদীর কুল উপচানো পানি। আশেপাশে বাড়ী নেই বললেই চলে। যে কয়টা বাড়ী আছে তাও রাস্তার ধারে। লোক চলাচল কম থাকায় এলাকাটা একেবারেই শুনশান।

দুদিন পর ডরথির বিয়ে, আগামীকাল তার গয়ে হলুদ। সবে লেখাপড়া শেষ করেছে এ বাড়ীর একমাত্র আদরের নাতনীটি। আজকের এই শান-শওকত আর জৌলুশের মুখ দেখতে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে তার দাদুকে। ডরথির ডাক্তার বাবাই তার একমাত্র সন্তান। বাড়ীতে মানুষ বলতে হাতে গোনা পাঁচ জন। এছাড়া রয়েছে কাজের বুয়া।

সন্ধ্যার একটু আগে বিয়ের শেষ সপিং করে মাকে নিয়ে বাসায় ফিরেছে।
বুয়াকে বললো খালা, দীদা কোথায়?
বুয়া উত্তর দিল বাহিরে গেছে কিন্তু কোথায়, বলে যায়নি।

ডরথি ভেবেছিল দীদাকে সাথে নিয়ে সপিং আইটেমগুলো দেখবে, কিন্তু তা হলো না।

বুয়াকে খালা বলে ডাকে ডরথি। তারমতে আর দশজন মানুষের মত বুয়াও চাকরি করে, মাস গেলে বেতন পায়। তার কাজ ছোট হতে পারে। তবে এই ছোট কাজের কারণেই আমাদের ভাল থাকা। আমাদের ভাল থাকাটা যদি এতই বড় হবে তাহলে তার কাজ ছোট হয় কিভাবে?
এসব ভাবতে ভাবতে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেস হয়ে সপিং করা জিনিসগুলো নিয়ে চেক করতে বসলো। এটা সেটা দেখতেই তার মনে হলো রাতটা পার হলেই তার গায়ে হলুদ। কি এক অদ্ভুত ভাললাগা কাজ করছে মনের ভিতরে, যেন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে।

তার দীদা এসেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। গাড়ীর শব্দও তার কানে পৌঁছায়নি।
-দিদিভাই কি করিস
দীদার ডাকে হুশ ফিরলো ডরথির। এতক্ষণ আসলে কিছুই চেক করা হয়নি, শুধু আনমনে দেখেই গেছে।

-সপিং আইটেমগুলো চেক করছিলাম, তুমি এসেছো ভাল হয়েছে। আসো একসাথে চেক করি। কিন্তু তুমি গিয়েছিলে কোথায়?
-পরে বলবো, এখন তোর হাতটা দেখি।
ডরথি হাতটা বাড়িয়ে দিলে দিদা তার অনামিকায় একটি আংটি পরিয়ে দিয়ে বলে এটা খুব যত্ন করে রাখবি।
-মানে?
-মানে তোর যত অলংকার আছে তার মধ্যে এই আংটিটা খুব যত্ন করে রাখবি। এটার পরবর্তী অধিকারী হবে তোর প্রথম সন্তান। বলতে চাচ্ছি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে আংটি ঘুরবে শুধু প্রথম সন্তানের হাত দিয়ে।
কেমন যেন রহস্য রহস্য লাগছে ডরথির কাছে, বলে এমন কেন?
-তোকে বলবো পরে, তোরও জানা দরকার। এখন দেখা দেখি কি কি আনলি ?
- না তুমি আগে বলো রহস্যটা কি? ডরথি খেয়াল করে দেখলো তার দীদার মুখটা একটু মলিন। খুব মায়া লাগলো তার।
-দিদা বলে, ঠিক আছে বলবো তো, তবে এখন না, ডিনারের পরে।

একগাদা জিনিষ নিয়ে তারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে গল্প করছে। মাঝে মাঝে ডরথি চেষ্টা করছে দীদার সাথে খুনসুটি করতে কিন্তু দীদা হাসছে বটে প্রাণহীন। তাই আর বৃথা চেষ্টা না করে ডিনারের অপেক্ষায় রইল।
ডরথি তাড়াতাড়ি ডিনার শেষ করে দীদার পাশে দাঁড়ালো। তার যেন তর সইছে না।
দীদা বুঝতে পেরে বললো ছাদে যা আমি আসছি।

ডরথিদের ছাদটা খুবই সুন্দর। চারিদিকে অনেক দূর পর্যন্ত ফাঁকা। ডরথি সাধারণত নদীর দিকে মুখ করে বসে। নদী থেকে বয়ে আসে ঠান্ডা হাওয়া। খুব ভাল লাগে তার।

কিছুক্ষণ পরে দীদা এসে বসে ডরথির পাশে, মুখটা অন্য দিকে ফেরানো। কোন ভূমিকা ছাড়াই দীদা গল্প শুরু করেন।
-আমার যখন জ্ঞান হলো তখন নিজেকে আবিষ্কার করি অনাথ আশ্রমে। আমার বাবা-মা কে আমি জানি না।
এই কথা শোনার পর ডরথি অবাক চোখে দীদার দিকে তাকায় কিন্তু তার মুখ অন্য দিকে ফেরানো। দীদার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে, যেন আমি আছি তুমি বলে যাও।

-আশ্রমে খুব কষ্ট করে এস.এস.সি পাশ করার পর এইচ.এস.সি ভর্তি হই কলেজে। সে সময় পড়াশোনার খরচ এবং নিজের খরচ মেটানোর জন্য পরিচালকের অনুমতি নিয়ে আশ্রমের বাহিরে টিউশনি শুরু করি। এ ব্যাপারে পরিচালক খুব সাহায্য করেছেন। শুরুর দিকে কয়েকটি টিউশনি জোগাড় করে দিয়েছিলেন।

এইচ.এস.সি পাশ করার পর আমার এক স্টুডেন্টের মামা পরিচালকের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। পরিচালককে বললাম বিয়ের পর যদি মাস্টার্স পর্যন্ত পড়ার সুযোগ থাকে তাহলে আমি রাজি। দু’পক্ষের মধ্যে কথা ঠিক হয়ে পরের সপ্তাহে বিয়ের দিন ঠিক হলো।
বিয়ের আগের দিন তোর দাদু তার এক বন্ধু মিজান ভাইকে নিয়ে আসলেন আমার সাথে পরিচয় করানোর জন্য। সেদিন মিজান ভাই দিয়েছিলেন এই আংটিটা।

মিজান ভাই ভালবাসতো একটি মেয়েকে, বিয়ের দিন-তারিখ সব ঠিকঠাক কিন্তু বিয়ের আগের রাতে ডেকোরেটরের ফেলে যাওয়া ইলেকট্রিক তারে জড়িয়ে মেয়েটি মারা যায়। এরপর মিজান ভাই অনেকদিন পাগলের মত জীবনযাপন করেছেন। ভাল হওয়ার পর আর বিয়ে করেননি। উনি চান ভালবাসার এই স্মৃতি তার প্রিয়জনদের হাত হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে ঘুরে ফিরুক। তাছাড়া আমাদের দুঃসময়ে তোর দাদু এই আংটি বন্ধক রেখে ব্যবসার মুলধন জুগিয়েছিল। তাই এটা আমাদের কাছে আরো মূল্যবান।

ডরথির দুচোখ বেয়ে ঝরছে অশ্রু ধারা, ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বললো মিজান দাদুর সাথে দেখা করা যাবে?


ছবিঃ গুগল।



কিছু কথাঃ আমি যখন প্রথম একাউন্ট খুলি তখন সেফ না হলে মন্তব্য করা যেত না।
সে সময় নিজের ব্লগেই একটা পোস্ট করেছিলাম। ১ দিন পর ১ম মন্তব্য এলো মৃত্যুঞ্জয় দাদার কাছ থেকে।
কি যে ভাল লেগেছিল সে সময়, সেই অনুভূতি বোঝাতে পারবো না। সে সময় মনে হয়েছিল এতগুলো মানুষের মাঝে দাদাই আমার ছাতা। তারপর থেকে দাদাকে আর পাইনি।
দাদাকে বলেছিলাম ১ম মন্তব্য করার জন্য আমি আপনাকে মনে রাখবো। তাই মৃত্যুঞ্জয় দাদাকেই উৎসর্গ করলাম।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১:৩৭
১৯টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হাটহাজারী আপডেট

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:৫৪

হাটহাজারী মাদরাসায় সাত হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন। কওমি ধারায় এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী মাদরাসা।
হেফাজতে ইসলামের আমীর শাহ আহমদ শফী হাটহাজারী মাদ্রাসায় ৩৬ বছর একক কর্তৃত্ব ছিল।
এই তিনযুগ ধরে তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

টুকরো টুকরো সাদা মিথ্যা- ১৮৫

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:৫৭



১। বাড়ির বউদের মধ্যে যদি হিংসা কিংবা ঈর্ষা ভাব থাকে, তাহলে ভাইয়ে-ভাইয়ে সম্পর্কও নষ্ট হয়ে যায়।

২। একটি রুমে ১২ জন মানুষ আছে। এদের মধ্যে কিছু সৎ এবং কিছু অসৎ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অম্লতিক্ত অপ্রিয় সত্যাবলি

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:৫৭

আপনি বই পড়ছেন, পাশের লোক নিজের বই
রেখে বার বার আপনার বইয়ে চোখ রাখছেন;
তিনি ভাবছেন আপনি রসে টইটুম্বুর ‘রসময়গুপ্ত’
পড়ছেন।
নিজের অপরূপা সুন্দরী বউ নিয়ে পার্কে ঘুরছেন।
শত শত পুরুষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ, সমাজ এবং ধর্ম

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ বিকাল ৫:৩১



প্রতিটি ধর্মের জন্ম হয়েছে ভয়ের মাধ্যমে।
আমার চিন্তা করার জন্য একটা মস্তিষ্ক রয়েছে আর ভালোমন্দ বিচার করার মত সামান্য হলেও বোধবুদ্ধি আর শিক্ষা রয়েছে, যদিও সেটা যথেষ্ট না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

নেকড়ে,কুকুর আর বেড়াল-(একটি ইউক্রাইনান মজার রূপকথা)

লিখেছেন শেরজা তপন, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৩৫


স্তেপে বিষন্ন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল এক ক্ষুধার্ত কুকুর। বুড়ো হয়ে গেছে সে ,আগের মত দৌড় ঝাপ করতে পারেনা , চোখেও ভাল দেখেনা। ক’দিন আগে মালিক তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সেই থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×