somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন ‘না’-বালকের প্রথম ও শেষ ধূম্রপানের ইতিহাস!!!!

৩০ শে নভেম্বর, ২০১৭ রাত ১২:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমার ভীষণ হিংসে করতে ইচ্ছে করে মংলু, রতন ও কান্দুড়ুকে । পান্তা খাওয়ার পর জমির আলে (আইল) বসে কী মিষ্টি করে যে হালিম বিড়িতে সুখ টান দেয়। মুগ্ধ আমি বিস্মিত আমি তা বিস্ফারিত চোখে অবলোকন করি। খালি মনে হতে থাকে কবে সে দিন আসবে যে দিন মংলুদের মতো এই আমি মদিরাতে সুর তুলতে পারব। সুখটানের সুখে হৃদয় নাচাতে পারব।

আমার ভাবনার আকাশে সুখের পাখিরা পতপত করে উড়ে বেড়ায় বিড়ি খাওয়ার দৃশ্য কল্পনাতে। ইতোমধ্যে একদিন চাচাতভাই ক্লাস থ্রিতে পড়া কবির কান্দুড়ুর সহায়তায় বিড়ি খেয়ে মাথা ঘুরে চিৎপটাং। কাদা-পানিতে মাখামাখি। এ কথা শুনে বয়সে অল্প কিছুদিনের বড় আমিও নিজের মধ্যে একটি চ্যালেঞ্জ অনুভব করলাম। কি আছে হেথায়?

শেষে আরো কয়েকজন শিষ্যকে নিয়ে বিড়ির খোঁজে বের হয়ে পড়লাম। কিন্তু বিধি বাম! দোকানদারা হরতাল ডেকেছে আমাদের মন্ডলের পুতদের বিড়ি দেবে না। শেষে তাদের দোকান করা নিয়ে না টানাটানি শুরু হয়। কিন্তু আমরা নব্য হবু বিড়িখোর বাহিনী হাল ছাড়তে রাজি নয়।

শেষে কৌশল অবলম্বন করতে হল। এক মহিলা দোকানদারকে গিয়ে বলা হল এই বিড়ি কাজের লোকদের দেওয়ার জন্য বাবা পাঠিয়েছে। এতে সন্দেহ করার কিছু নেই। মাঝে মাঝেই কাজের লোকদের জন্য বিড়ি কিনতে হত। ফলে বিনা বাধায় বিড়ির সংস্থান হল। কিন্তু ঝামেলা বাঁধল কোথায় এর সৎকার হবে।


এটা একটা মারাত্মক বিষয়। ধরা খাওয়ার ভয় আছে। অনেক আলাপ-আলোচনার পর সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেল। খলার মাঝে (বাড়ি থেকে বেশ দূরে যেখানে ধান মাড়া হয় ও খড়ের স্তুপ রাখা হয় তেমন বৃহদাকার আমবাগানের মাঝে উন্মুক্ত স্থান) খড়ের গাঁদার পাশে বিশাল আম গাছের চিপায় বসে জীবন কা পেহেলীবার ধুঁয়ার স্বাদ! ভয় আছে আগুন লাগার। কারণ এই ধানের পালাগুলো তখনো মাড়া হয় নি। এক একটা পালা প্রায় দুশ-মণ তিনশ-মণ ধানের। কোনভাবে আগুন টাগুন লাগলে আমাদের দফারফা হবে। তাই সাবধানে এগুতে হবে। এই পালাগুলোর চিপা বাদে তেমন যুতসই স্থান পাওয়া যাচ্ছে না যেখানে পান করা যেতে পারে।

ভীষণ উত্তেজনা। হালিম বিড়ি। ২৫ টাতে প্যাকেট। একটি দিয়াশলাই। চারজন। যখন দিয়াশলাইয়ের কাঠিতে প্রথম ঠোকাতে ফস করে আগুন ঝলসে উঠল। মনে হল যেন এ আগুন কাঠিতে নয়, আমাদের হৃদপৃন্ডে দপ করে জ্বলে উঠল। কচি মুখগুলোর জ্বলন্ত শলাকার দিকে লোভাতুর চাহনী দেখে ঈশ্বরও হয়ত টানটান উদ্বেগে লক্ষ রাখছিলেন। হয়ত ভাবছিলেন, এতে কী এতই মজা?

এভাবেই চলছিল বেশ। একেক দিন একেকজন গিয়ে বিড়ি ও দিয়াশলাই নিয়ে আসি। আর পালা ও আমগাছের চিপায় বসে সুখ-সাগর পাড়ি। বেশ কিছুদিন এভাবে চলার পর আমাদের দোকানী মহিলার মনে সন্দেহ জাগে। সে গোয়ান্দাগিরি করে। আমরাও কম নয়। বিড়ি নিয়ে প্রথমে কাজের লোকদের কাছেই যাই। সেখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে পরে আমাদের আস্তানায় গিয়ে জলসার আসর বসাই।

কোন একদিন বিকেলে দোকানী মহিলা নিজের গরু মাঠে নিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের খলার ভিতর প্রবেশ করতে দেখে। তারপর সন্দেহবশত নিজ চউক্ষে কি করি আমরা তা দেখার জন্য আমাদের পিছু নেয়। তখনই হাতেনাতে ধরে ফেলে মন্ডলের পুতদের কুকীর্তি।
এরপর যা হবার তাই ঘটল। সবকিছু মিসাইলের মতো দ্রুত ঘটছে। আমরা বিকেলের পর বাসায় ফিরতে পারছি না। কারণ ইতোমধ্যে রাষ্ট্র হয়ে গেছে মন্ডলের বাচ্চাদের ভয়ঙ্কর কান্ডকীর্তি। ভয়ঙ্কর এই কারণে যে আমরা কৃষককুলের সন্তান তাদের সারাবছরের সঞ্চয় ঐ বিশাল ধানের পালার কাছে গিয়ে এই কুকীর্তিগুলো করেছি। কোনভাবে যদি আগুন ধরে যেত ধানের পালায়। তাহলে তো গোটা বছরই মাটি তাদের।

বোকা আমরা এত কিছু ভাবার সময় কই। সবাই আত্নগোপনে বিভিন্ন জায়গায়। ইতোমধ্যে সন্ধ্যায় খবর পেলাম একজন গ্রেফতার খেয়েছে। মারের নাকি তুলকালাম আয়োজন চলছে। আমার তো মনে হচ্ছে এখন কেউ যদি আমাকে পাশের ভারতের কাঁটা তারের বেড়াটা পার করে দিত। তাহলে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ভিক্ষা-টিক্ষা করে জীবন সুন্দরভাবেই পার করে দিতে পারতাম। নিজেকে আমি ছোটা ভিক্ষুক ভাবা শুরু করেছি।

আমি মহিষের গোয়ালের হাড়ং (যেখানে মহিষদের ডিনার :P হিসেবে খড় দেওয়া হয় সারারাতের জন্য) এ লুকিয়ে আছি। সাধারনত এশার আজানের পর রাখালেরা মহিষ গোয়ালে তোলে। ততক্ষণ পর্যন্ত নিরাপদে থাকা যাবে। লুকোচুরি খেলার সময় এই উঁচু হাড়ংগুলো আমাদের লুকানোর খুব ভালো জায়গা। কারণ ভিতরে প্রচুর খড় থাকে। পিচ্চি আমরা সহজেই আত্নগোপন করতে পারি।



কিন্তু আমার এই গোপন গুহার খবর বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। বাকি সাগরেদরা ধরা খাওয়ায় ফাঁস করে দিয়েছে আমার সম্ভাব্য স্থানগুলোর নাম। একটু পরেই বড় আপার কমান্ডে বিগাল দা’র অনুসন্ধানী টিম চিরুনি অভিযান চালিয়ে আমাকে গ্রেফতার করে মার্চ করতে করতে বাড়িতে নিয়ে চলল। চারিদিকে কৌতুহলী চোখের জটলা। মনে হচ্ছে যেন চার ফুটের সিরিয়াল কিলারকে র‍্যাবের স্পেশাল স্কোয়াড পাকড়াও করে হেডকোয়ার্টারের নিয়ে যাচ্ছে। আমার ভয়ের প্রতিক্রিয়া হিসু ও এর চেয়েও বড়টার কাছাকাছি পর্যায়ে চলে গেছে। আল্লাহ মালুম! কী ধরণের খানাপিনার ব্যবস্থা করেছে।

অবশেষে বড় আপার নির্দেশে কার্পেট পিটানির পর দোয়া-দরুদ পড়ে শুদ্ধ করা হল। অবশ্য আমি যে শুদ্ধ হয়েছি তা বুঝতে এক সপ্তাহ লেগেছিল। কারণ রামছ্যাচা খাওয়ার পর সাতদিন বিছানাগত। এরপর মুক্ত আকাশ দর্শন। নিজেকে মুক্ত বিহঙ্গের মতোই মনে হচ্ছিল শুদ্ধ আমি।


পুনশ্চঃ আমাদের ওখানে বেশ আগে হিড়ি পাগলা নামে একজন ছিল। বাজারে প্রায়শই সে এলাকার নতুন জামাইদের নানাভাবে প্যাঁচে ফেলত। এ ব্যাপারে সে কামেল আদমী। কারণ সদ্য বিবাহিত জামাই বাবুরা জানতই না এ পাগল। তো হিড়ি পাগলা এক জামাইকে বলছে, ‘তুই বিড়ি (সিগারেটকে বিড়ি হিসেবে ধরে নিয়েছে) খাস। তোর ফুসফুস চ্যাপ্টা খেয়ে গ্যাছে। কলজাই কালা পানি খলবল করছে। তুই তো মরবু কদিন পরেই। হারামজাদা, বিড়ি খাস ক্যান’।
ইতোমধ্যেই ভ্যাবচ্যাকা খাওয়া নব জামাই ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। তারপর একটু চুপ থেকেই হিড়ি পাগলার খুব মিষ্টি সুরে বিড়ির আবদার। ‘জামাই একটা বিড়ি দিবু’।

**ধূমপান বিষপান, যদি বাঁচতে চান, তবে না খান???? :P :P

ওস্তাত নুসরাত ফতেহ আলী খানের একটি ক্লাসিক শুনে ঘুমাতে যান...।



প্রথম ছবি: অন্তর্জাল
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে নভেম্বর, ২০১৭ রাত ১২:৩৪
৪৮টি মন্তব্য ৪৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কাঁচপোকা লাল টিপ অথবা ইচ্ছেপদ্ম...

লিখেছেন নান্দনিক নন্দিনী, ১২ ই জুলাই, ২০২০ রাত ১২:২৯



‘হৃদয়ে ক্ষত- তা তোমার কারণেই
তাই, তুমিই সেলাই করে দেবে-
বিনা মজুরিতে।
কিছু নেই এমন যা দিতে পারি তোমাকে;
ঠান্ডা মাথায় দেখেছি অনেক ভেবে!
যদি নাও দাও তবে থাকুক এ ক্ষত
এ ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামে নিকাহে মুত'আ বা সাময়িক বিবাহের বিধান ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ১০:৪৬

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ অন্তর্জাল।

ইসলামে নিকাহে মুত'আ বা সাময়িক বিবাহের বিধান ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

নিকাহে মুত'আ কাকে বলে?

আরবি: نكاح المتعة‎‎, English: 'wedlease'। নিকাহ মানে, বিয়ে, বিবাহ। আর মুত'আ অর্থ, উপকার ভোগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বন্ধু, কি খবর বল...

লিখেছেন পদ্ম পুকুর, ১২ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ১১:০১


সময়ের হাওয়া গায়ে মেখে ভাসতে ভাসতে যখন এই অব্দি এসে পড়েছি, তখন কখনও কখনও পেছনে ফিরতে ইচ্ছে হয় বৈকি। কদাচিৎ ফিরে তাকালে স্মৃতির পাতাগুলো বেশ উঞ্চ এক ওম ছড়িয়ে দেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ যা পারেনি নেপাল তা করিয়ে দেখালো!

লিখেছেন দেশ প্রেমিক বাঙালী, ১২ ই জুলাই, ২০২০ দুপুর ১২:২৭



ভারতীয় যত টিভি চ্যানেল আছে তা প্রায় সবগুলোই বাধাহীন ভাবে বাংলাদেশে সম্প্রাচারিত হচ্ছে কিন্তু বাংলাদেশে একটি টিভি চ্যানেলও ভারতে সম্প্রচার করতে দেওয়া হয়না। ভারতের কিছু কিছু চ্যানেলের মান অত্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যবধান

লিখেছেন মুক্তা নীল, ১২ ই জুলাই, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:২৭




পারুল আপা আমাদের সকলের একজন প্রিয় আপা। তিনি সকল ছোটদের খুবই স্নেহ আদর ও আবদার পূরণে একধাপ এগিয়ে থাকতেন। অতি নম্র ও ভদ্র তার কারণে বাড়ির গুরুজনদের কাছে এই আপার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×