somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চামড়ার কু-বাণিজ্য ও কর্তৃপক্ষের অবহেলা-অব্যবস্থাপনা!!!

১৪ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



জাতীয় সম্পদের বেফাজিল অপচয় এ দেশে হ্যালির ধুমকেতু নয়। বরং বলা চলে K-POP’র মতো নয়া নয়া খাসলতে চক্ষুগোচর হয় আর কি! আর এই গ্যাংনাম স্টাইলের মূল ভুক্তভোগী সেই চির নবিন ভুখানাঙ্গারা? আর এসব ‘কু-স্টাইল’ দেখে গলার রোগ ফুলাইনন্যা হাউকাউ পার্টি তথাকথিত আমরা। যদিও ফলাফল। বিরাট অশ্বডিম্ব। দশকের পর দশক সেই ‘ঘুরালে লাঠি ফিরালে কোঁতকা’। কর্তৃপক্ষ নাকে ‘সুরেশ সরিষার তেল’ মেখে আশিয়ান সিটির স্বপ্নে বিভোর ও বেহুঁশ!

অপরিকল্পিত নীতি, অনিয়ম, অদূরদর্শিতা ও সর্বোপরি অব্যবস্থাপনার ক্রমপুঞ্জিভূত রূপ হচ্ছে এই রাস্তায় চামড়ার গড়াগড়ি। অথচ পরিকল্পিত নীতি ও দূরদর্শী ব্যবস্থাপনায় চামড়াখাত হতে পারত সোনার ডিম পাড়া হাঁস। কিন্তু কে হায় চামড়া ছিলে নীতির কথা পাড়তে আসে এ রূপসী বিবিধ বঙ্গে? ঐ অনিয়মেই যে মোদের অনির্বাণ সুখ! আচ্ছা, ছাড়ুন, এসব রং ঢং।

বরং চলুন একটি হিসেব মিলাই। ধরুন, ব্লগার রাজীব নুরের ৯০ হাজার টাকার কালো গরুর দানকৃত চামড়াটা ছিলছিলা ইয়াতিম খানার হুজুর বিক্রি করল ৪০০ টাকায়। সেটা চামড়া ব্যবসায়ীর মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়ে ২০ বর্গফুট ক্রাস্ট চামড়া পাওয়া গেল। যা চীনে রপ্তানী হল (২০*১৫০) = ৩০০০ টাকায়। চীন সেই চামড়া দিয়ে চমৎকার ৩টি হ্যান্ডব্যাগ ও ৫ জোড়া জুতা তৈরি করল ‘Louis Vuitton’ ব্রাণ্ডের নামে। সেই হ্যান্ডব্যাগ প্রতি পিস ৭,০০০ টাকা ও জুতাগুলো প্রতি জোড়া ৪,০০০ টাকায় ঢাকার অভিজাত একটি রিটেইল আমদানী করে আনল।

মাস দশেক পরে ব্লগার রাজীব নুর মাগুর মাছের মতো হাসি দিয়ে সুরভী ভাবীকে নিয়ে রোজার ঈদের বাজার করতে গেল সেই অভিজাত রিটেইলে। এবং ‘ওয়াও’, ‘অসাম’, ‘দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে’ বলে একটি হ্যান্ডব্যাগ ১০,০০০ টাকায় ভাবীকে কিনে দিল। সুরভী ভাবীও এই খুশিতে ডেলা সেজে রাজীব ভাইকে নজরানা হিসেবে এক জোড়া সেই জুতা কিনে দিল ৬,৫০০ টাকায়। এরপর মনের আনন্দে দুজনে ৯০ হাজারী মিঃ ব্লাক কাউ'র চামড়ার ব্যাগ ও জুতা নিয়ে বাসায় ফিরল।

আচ্ছা, এবার হিসেব করুন তো, একটি হ্যান্ডব্যাগ ও এক জোড়া জুতার দাম যদি...তাহলে রাজীব ভাইয়ের এক কালো গরুর চামড়া দিয়ে কত টাকার ব্যবসা হল। এখানে কে কে লুজার আর কে কে...?



আমাদের সরকারগুলোর পোশাকশিল্প নিয়ে এক ধরণের ঘোর কাজ করে। ফলে উনারা এই শিল্প বাদে আর কোনো দিকে মনোযোগ দেওয়ার তাগিদ অনুভব করেন না। ফলে দেশের মোট রপ্তানী আয়ের সিংহভাগ(প্রায় ৮৪ শতাংশ) এখনো ঐ একমাত্র তৈরি পোশাক। এই একমুখী রপ্তানী যে কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য বিরাট ঝুঁকিপূর্ণ তা মির্জা আজিজুল, আকবর আলী খান, জাহিদ সাহেবরা বলে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত । কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এখান থেকে রপ্তানীকে বহুমুখী করার কোনো প্রকার উদ্যোগ যথাযথভাবে পালন করা হয় না। কেন হয় না সে বিরাট রহস্য? এখানেই তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতি, রাজনীতিক ও আমলাদের গোপন প্যানডোরার বক্স যা অলওয়েজ হিডেন।

আমরা জানি, গার্মেন্টেসের র-ম্যাটেরিয়াল প্রায় সম্পূর্ণ আমদানীকৃত। অথচ এই চামড়াশিল্পের জন্য র-ম্যাটেরিয়াল প্রায় পুরোটাই দেশি। গার্মেন্টসকে যেভাবে প্রণোদনা দেওয়া হয় সেভাবে চামড়া শিল্পের প্রতি সরকারগুলো লক্ষ্য দিলে আজ ১ বিলিয়নের(বিশ্ব চামড়া বাণিজ্যের ০.৬ শতাংশ) জায়গায় ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানী আয় করা সম্ভব হত চামড়াজাত পণ্য রপ্তানীর মাধ্যমে। যেখানে চীন বাংলাদেশ থেকে প্রক্রিয়াজাত চামড়া আমদানী করে তা অন্য দেশে নানা ধরণের পণ্য তৈরি করে রপ্তানীর মাধ্যমে বিলিয়ন ডলার আয় করছে। আমাদের পাচারকৃত চামড়া দিয়ে ভারতের ট্যানারীগুলো জমজমাট। আর আমাদের ট্যানারী নাকি ব্যবসা করতে না পেরে নিজেদের ব্যবসা থেকে গুটিয়ে নিচ্ছে।

কতটা অব্যবসায়ী-বান্ধব পরিবেশ হলে এই অবস্থা হতে পারে? এক হাজারীবাগ থেকে ট্যানারী সরাতে দুই যুগ লাগে। এক সেন্ট্রাল ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) তৈরিতে এক যুগ লাগে? সেটাও ভেজালে পরিপূর্ণ, অপরিকল্পিত। এগুলো দেখার কেউ কোথাও নেই। আর এই কোথাও কেউ নেই অবস্থার শিকার হচ্ছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ নানাভাবে, নানাউপায়ে। আমরা সবাই জানি এই চামড়া বিক্রির টাকাটা প্রায় পুরোটাই যায় এতিমখানা কিংবা গরীব দুঃখী মানুষের কল্যাণে। সেখানে তারা নিদারূণভাবে বঞ্চিত।

এই ধান, চামড়া, শাকসবজী ইত্যাদি ইত্যাদির জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত সেই সাধারণ বাংলাদেশীরাই যারা জীবনের বড় একটি অংশ কায়িক শ্রমের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। আমাদের সরকার বাহাদুরদের তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত দেওয়ার সময় কোথায়? তারা আমলাদের সাথে নিয়ে দশকের পর দশক ব্যস্ত ঢাকার কোন জায়গায় নন-সাসটেইনেবল ও অদ্ভুতুড়ে উড়ালসড়ক হলে দেশের উন্নতি ত্বরান্বিত হবে ও সাথে হবে নিজেদের পকেট স্ফিত...।

আসলে আমাদের উন্নতির অন্তরায় অর্থনৈতিক নয়, এটি পুরোটাই রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা। অনেক আগে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন কেইনস লিখেছেন---
অভাব ও দারিদ্রের সমস্যা এবং শ্রেণি ও জাতিসমূহের মধ্যে ইকোনোমিক স্ট্রাগল একটি ভয়ঙ্কর বিভ্রান্তি মাত্র, একটি অস্থায়ী ও অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি মাত্র। আমরা যদি সঠিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারি তবে আজকের পাশ্চাত্য বিশ্বে যে সম্পদ ও কারিগরী জ্ঞান রয়েছে তা আজকের অর্থনৈতিক সমস্যাকে...গৌণ সমস্যাতে পরিণত করতে সক্ষম...বরং বলা চলে আমাদের প্রধান সমস্যা হল ভালোভাবে বেঁচে থাকার সমস্যা, মানবিক সম্পর্কের সমস্যা, উৎপত্তির সমস্যা এবং সর্বোপরি আচরণ ও চিরাচরিত ধর্মের সমস্যা।’
(পরার্থপরতার অর্থনীতি, আকবর আলি খান)

সময়ের সাথে সাথে সভ্য পরিমণ্ডলে মানুষের, সমাজের, জাতির উত্তরোত্তর উন্নতি হয়। আমাদের কী হচ্ছে তা যদি বিজ্ঞ ব্লগারেরা বলতেন? নাকি আমাদের পরিমণ্ডলটাই ...সভ্য!!
******************************************************************************************
আখেনাটেন/আগস্ট-২০১৯
@হুমকির-মুখে-চামড়াশিল্প--ইত্তেফাক
@চামড়ার-দামে-ধস-কার-লাভ-কার-ক্ষতি-প্রথম আলো
@ন্যায্য-দাম-না-পেয়ে-৯০০-চামড়া-মাটি-চাপা-প্রথম আলো
@বিক্রি-করতে-না-পেরে-রাস্তায়-ফেলে-দিলেন-চামড়া-প্রথম আলো
@-চট্টগ্রামে-৩০০-টাকার-চামড়া-৫০-টাকাও-বলছে-না-প্রথম আলো
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ১০:৪৭
৪৮টি মন্তব্য ৪৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মনস্তাপ

লিখেছেন ইসিয়াক, ১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ সকাল ৭:৩৫


কি গান শুনবে বলো প্রাণাধিক প্রিয়?
তুমি কি চেয়ে দেখো মোর মুখপানে?
দেখো না।
খিড়কী খুলে বসে আছি ,
রয়েছি বাতায়নে পথ চেয়ে, তোমারই পথ পানে।
একমনে সুর সাধি, যদি তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাস্তায় পাওয়া ডায়েরী থেকে-১২১

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ সকাল ১০:০৩



১। রবীন্দ্রনাথ কোনো রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সমাজ সচেতন এবং সমাজ বৈষম্য নিধনকারী, পবিরর্বতনকামী নাগরিক। তিনি চেয়েছেন মানুষের মধ্যে ঐক্য ও উদার মানবিকতার প্রতিফলন ঘটুক। তিনি... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙালি মেয়েরা না কি নোংরা, তাদের না কি মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর কেউ ছোঁবেও না!!!!!!!!!!!!

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ সকাল ১০:৩৪


প্রতিবাদকারীরা দ্য হেগের পিস প্যালেসের সামনে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের সমর্থনে একটি বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। 10 ডিসেম্বর, 2019 এএফপি

বাঙালি মেয়েরা না কি নোংরা, তাদের না কি মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

তবু যদি থেমে যায় সব কল্পনা

লিখেছেন স্বপ্নবাজ সৌরভ, ১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:৩৪



জাঁকালো শীত পড়েছে। রেল লাইনের ধারে কালাইয়ের রুটির দোকানে ভীড়। স্টেশন সরগরম - সেদ্ধডিম , ঝাল মুড়ি। অপেক্ষা আর ব্যস্ততা। জবুথুবু যাত্রীরা চায়ের দোকানে , অনবরত... ...বাকিটুকু পড়ুন

সু-চি'র বক্তব্য নিয়ে সাধারন মানুষ যা ভাবছেন

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:৪৮



১। নেদারল্যান্ডের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সরবরাহ করা স্ক্রিপ্ট পড়ে বিশ্ববাসীর সামনে মিথ্যাচার করলেন সু-চি! এই মানুষরুপী শয়তান মহিলা কিভাবে নোবেল পেয়েছেন তা আমার মাথায় ঢুকছেনা!

২। কত বড়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×