somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শেইপ শিফটার –দাঁড় কাক

১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


শীত প্রায় চলেই এসেছে। অক্টোবর মাস, ২০০৯.
মন্ট্রিয়ল শহরে বেশ ঠান্ডা। ঝিরঝিরে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা বেশ ভাল লাগে সুমনার। কিছুক্ষণ পরপর একটা করে ঠান্ডা ঝাপটা কোথা থেকে এসে যেন সারাটা শরীর আদর করে বুলিয়ে দেয়। দেশে তো হিমালয়ের ঠান্ডা বাতাস আছে। মন্ট্রিয়লের উত্তরে মেরু অঞ্চলের তুষার আবৃত পাহাড় আছে। প্রতিদিন সূর্য ঝলমল সকালে সুমনা বের হয়ে পড়ে তার কাজের উদ্দেশে। একটা একটা অলিগলি পার হতেই চোখে পড়ে মোড়ে মোড়ে একটা করে চার্চ। ঢাকাকে যদি মসজিদের শহর বলা যায়, মন্ট্রিয়লকে বলা যেতে পারে চার্চের শহর।
আজ দিনটা যেন কেমন এক অদ্ভুত রকমের সুন্দর। বড় রাস্তার একদিকে গাছ দিয়ে ঢাকা। তার ছায়ার নিচ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে একটু পর পর কারুকাজ খঁচিত প্রাচীন ইমারতের গীর্জাগুলো চোখে পড়ছে। রাস্তার ঐ পাড়ে নটরডাম স্কুল। দেখলেই সুমনা ভাবে, ‘একদিন আমি এ স্কুলে শিক্ষকতা করবো।’ কিন্তু তা কি সম্ভব? মাতৃভাষা ফ্রেঞ্চ না হলে তো স্কুলে শিক্ষকতা সম্ভব না। সুমনা ইউনিভার্সিটি অফ্ মন্ট্রিয়লে ছয় মাসের জন্য ভাষা শিক্ষার কোর্সে ভর্তি হবার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু জানুয়ারির কঠিন শীতের বরফ পেরিয়ে সেই পাহাড়ের চূড়ায় ক্লাস করবার ভয়ে ভাষাটা আর শিখাই হয় নাই। যদিও ওই ছয় মাসের জ্ঞান নিয়ে স্কুলে তো শিক্ষকতা সম্ভব না, তবে দোকানে কাজ করার জন্য, গ্রাহকের সাথে বাতচিৎ করার জন্য এধরণের কোর্সগুলো উপকারী। যেহেতু তা হয়নি তাই সুমনা ফ্রেঞ্চদের ভাষা বুঝেও না, বলতেও পারে না। কিন্তু ফ্রেঞ্চদের আদব কায়দা আর দৈহিক সৌন্দর্য্যর মুগ্ধতা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সারাক্ষণ। মনে মনে ভাবে, ‘মন্ট্রিয়ল শহর, আমার শহর। আমি এই শহরের –ই মেয়ে।’
এমন ভাললাগার চিন্তায় মগ্ন হতে না হতেই মাথা তুলে তাকালো পাশের কারুকাজ শোভিত গীর্জার দিকে। হুইল চেয়ারে চলাচল করা উপসনাকারীদের জন্য গীর্জার সামনে শক্ত স্টিলের রেলিং বসানো হয়েছে। এখন সকাল সাড়ে দশটা। চার্চের প্রার্থণার সময় শুরু হয়নি। গীর্জার সামনে পাকা করা উঠানে কিছু মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর স্টিলের রেলিং –এ বসে আছে কৃষ্ণবর্ণের একটা মেয়ে। কালোস্যুটের ফরমাল পোশাকে মনে হচ্ছে মেয়েটি চার্চের কোন কাজের সাথে আজ যুক্ত। বয়স ২০/২২ বছর হবে। কাঁধ পর্যন্ত কালো চুল। কোকড়া নয়। চোখ পড়তেই লক্ষ্য করলো মেয়েটি ঠাঁয় তাকিয়ে আছে তার দিকে। পলক ফেলে আবার তাকাতেই সুমনা দেখল ওখানে যেন একটা বিশাল দাঁড় কাক বসে আছে। মেয়েটি একদম উধাও। এক ঝলকের তফাতে মেয়েটি উধাও?
কোথাও নেই? এ কিভাবে সম্ভব?
চোখের ভুল নয় তো। একটা দাঁড়কাক কেন দেখতে পাচ্ছে ওই জায়গায়?
মেয়েটি কেন তার দিকেই ঠাঁয় তাকিয়ে ছিল এত পথচারীর ভিড়ে?
সারাদিনের কাজ শেষে একটু শংকা নিয়েই সুমনা সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এলো। কিছুতেই ভুলতে পারছে না মেয়েরূপী দাঁড়কাকটির কথা। মেয়ের জায়গায় এক ঝলকের জন্য একটা দাঁড়কাক দেখতে পাওয়া কেমন যেন এক এলোমেলো ব্যাপার।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত গড়াতেই শুরু হলো সুমনার গলা থেকে এক অদ্ভুত ঘড় ঘড় কাশির শব্দ। এই শব্দ এতো কিম্ভুতকিমাকার যে, একবার একটু কাশলেই আশপাশের বাসার সবার কানে পৌঁছে যাচ্ছে এই শব্দ। তার বিল্ডিং –এর একতলা থেকে জানালা দিয়ে শব্দ পৌঁছে যাচ্ছে দোতলা, তিনতলা ছাড়িয়ে সেই চারতলায় । গলার স্বর পালটে কি এমন শব্দ শুরু হলো ? তাও তো না? কোথা হতে আসছে এ শব্দ? সুমনার গলা চিরে আসা এই শব্দ তো সুমনার নয়। মনে হচ্ছে যেন কোন একটা যন্ত্র বসানো হয়েছে তার গলার ভেতরে।
ওর খুব ভয় লাগছে। খুব অসহায় লাগছে। আজ সকালে কাক রূপী মেয়েটার কথা মনে পড়ছে। পিশাচ যখন মানুষ রূপে আসে তার উপস্থিতি ধরে ফেলার মত অভিজ্ঞতা যে তখনো সুমনার হয়নি।

ছয় বছর পরের কথা। ২০১৫.
দেশের একটা কলেজে শিক্ষকতার কাজ নিয়েছে সুমনা। বিষয় গণিত এবং বিজ্ঞান।দেড় ঘন্টার লেকচার ক্লাশে খেয়াল করেছে একটি ছাত্রী ঘড়ি ঠিক ধরে এক ঘন্টা পর ক্লাশে প্রবেশ করে। পরনে পার্টির পোশাক। সাজগোজে পুরো ভারী মেইক –আপ। তিনি আর কেউ না, ব্যাংকার বাবা মায়ের একমাত্র আদুরে কন্যা। আব্দারের শেষ নেই। তার আবদার মেটাতে বাবা মায়ের চেষ্টার শেষ নেই। কিন্তু পড়াশুনায় তার মন নেই। শুধুই সবকিছুতে তার জিদ। সুমনা এসব তথ্য পেয়েছে প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে। এবার রেজাল্ট খারাপ হলে প্রধান শিক্ষক ডেকে পাঠালেন তার মাতা পিতাকে। তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, ছাত্রীর একাধারে সব বিষয়ে খারাপ নম্বর কেন। তাদের কন্যা বাসায় করে টা কি? বাড়ির কাজ? ঘরের কাজ? নাকি রান্নার কাজ?
বাবা মায়ের উত্তর, কিছুই করে না। তার শুধু রাগ আর রাগ।


সুমনা দেরী করে ক্লাশে আসা ছাত্রীটিকে আজ নিয়ে সামনে বসিয়েছে। পুরো দেড় ঘন্টার ক্লাশে ছাত্রীটি একবারও চোখের পলক ফেলেনি। ঠাঁয় তাকিয়ে ছিল তার টিচারের দিকে। যেন তার মধ্য দিয়ে কোন এক সত্তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে এই টিচার নাম্নী বস্তুটিকে। আগে কি তারা এমন কোন বস্তু দেখে নি? চারপাশে সবাই এখন তার কাছে ‘অবজেক্ট – লক্ষ্যবস্তু। কে এই সত্তা যে এই নিরীহ ছাত্রীটির দেহে বাসা বেঁধেছে? খুঁজে খুঁজে নির্ঝঞ্ঝাট একটি সুখী পরিবারের এই নরম মনের মেয়েটিকে বেছে নেয়া হয়েছে। পিশাচ লোক থেকে তারপর কাউকে পাঠানো হয়েছে এর দেহে। ভূ-লোকে এসে তারা পর্যবেক্ষণের কাজ নেমেছে। তাদের আচরণ আর মেজাজের খপ্পরে পড়ে আচরণগত বৈষম্যের শিকার হবে এই আধারটি। ভয়ংকর শব্দে চারিদিক প্রকম্পিত করে তুলবে মাঝে মাঝে।


ক্লাশে একদিন সময় মত এসেছিল ছাত্রীটি। কিন্তু ক্লাশে ঢুকবার প্রাক্কালে শুরু হল তার অতিপ্রাকৃত ভয়ংকরে সেই কাশি। যেমন সুমনাকে ধরেছিল সেই মন্ট্রিয়লে দাঁড়কাকটি। ছাত্রীটির স্বরে ভেসে আসা এই শব্দ চিনতে ভুল হয়নি সুমনার। দাঁড় কাক না হলেও পিশাচ লোকের কোন কিছুর নজর তো পড়েছেই। চলার পথে কখন কোন সময়ে ঝুপ্ করে পোর্টাল বেয়ে পিশাচরা নেমে এসে কার গলাটা চেপে ধরবে কে জানে।
আজ ছাত্রীটির অসুস্থতা সুমনা নিজ চোখে দেখেছে। নিজের ওপর দিয়ে না গেলে বুঝতো না পিশাচদের ভয়ংকর আক্রমণ কেমন হতে পারে। অপরের দুরবস্থা উপলব্ধি করতে পারতো না। সুমনা এখন জানে - যদি মুক্তি না মেলে এই পিশাচের হাত থেকে, তাহলে জীবনের সমাপ্তি অনিবার্য। কিন্তু কিভাবে বুঝবে কোন স্থানে কখন এ রকমের অক্রমণ হতে পারে ?
......
০৭/০৯/২০২৬
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২০
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ফ্যামিলি কার্ডের স্বার্থে তেলের দাম বৃদ্ধি মেনে নিতে হবে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৯


দীর্ঘ সতেরো বছর পর আমরা পেয়েছি একটি নির্বাচিত সরকার । অনেকে ভালোবেসে ইহাকে জনগণের সরকার বলে থাকেন । জনগণের সরকারের উপর একটু আস্থা রাখুন । সরকারকে সময় দিন ;... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩১



রাজধানী ঢাকা সহ দেশের নানা অঞ্চলে টমটম, অটোরিক্সা, নসিমন, করিমন চলাচল করে। বেশ মানুষজন পরিবহন সহ মালামালের বস্তাও টানাটানি করতে দেখা যায়। কিন্তু এইগুলোর দেশ হচ্ছে গ্রাম গঞ্জের বাজার আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৪


আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
আমার ডক্টর উপাধিটি মুছে দিও
জ্ঞানী, কবি, দরবেশ, সাধক, সফল, ব্যর্থ
এসব কোনো শব্দই যেন
মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমাকে আলাদা না করে।

কারণ আমি দেখেছি
অহংকার খুব সূক্ষ্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৬

১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু!

শিশুর অধিকার রক্ষা অবশ্যই সভ্য সমাজের দায়িত্ব। কিন্তু প্রশ্নটা তখনই কঠিন হয়ে ওঠে, যখন ১৭ বছর ১১ মাস ২৯ দিন বয়সী কেউ ধর্ষণ বা হত্যার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুনফুনা ফুন

লিখেছেন রাজীব নুর, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩



ছয় হাজার হাজার আগে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিলো মাত্র দশ লাখ।
হ্যা দশ লাখ। পুরো পৃথিবীর সব জায়গায় মানুষ থাকতো না। বনজঙ্গল ছিলো। আর সমুদ্র এবং নদী। পাহাড় পর্বত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×