somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শেইপ শিফটার – বেজী

২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


হেমন্তের সোনালী সকাল।
২০০৯ এর সেপ্টেম্বর।এই সময়টায় প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বের হয় সুমনা। সারা রাস্তা ধরে সোজা হেঁটে চলে যায় মন্ট্রিয়ালে শহরের শেষ প্রান্তে ।সেখানে একটা বাংলাদেশী কাপড়ের দোকান আছে। পাশে গ্রোসারি আছে। বাসা থেকে বের হলে দেড় কিলোমিটারের দূরত্ব হবে।
আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। দল বেঁধে পথচারীরা ঘুরতে বের হয়েছে। তাদের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ এগিয়ে এলো সুমনা একটা দলের সাথে। তার নিজের দেশেরই তিনজন মহিলা হাঁটছে একসাথে। একজন দেখতে হুবহু কলেজের ছেলে কণ্ঠের সেই জয়া নামের মেয়েটির মতন। আরেকজন শ্রীলঙ্কান চেহারার নাদিরা আন্টির মতন। ব্যক্তিত্ব যেন হুবুহু সেই আন্টির মত। চেহারাও একদম একরকম। মনে হচ্ছে নাদিরা আন্টির মত দুই পিস মানুষ ভগবান সৃষ্টি করেছিল। তার একজনের সাথে সুমনার আজ এখানে দেখা হয়ে গিয়েছে। আরেকজনের সাথে যেমন দেখা হয়েছিল তার বাল্যকালে। সেই সময়ের দেখা হওয়া আন্টিকে সুমনা তার মায়ের বান্ধবী হিসেবে দেখেছে। আর আজ আরেক কপি সামনে এসে পড়েছে তার চলার পথের সঙ্গী হিসাবে। পথচারী হিসেবে। ক্ষণিকের সহচরীও বলা যেতে পারে। তৃতীয় জন গড় বাঙালি মেয়েদের থেকে বেশ খানিকটা লম্বা। তিনজনের মাঝে সে বেশ সুঠাম দেহের অধিকারী। হাঁটার মধ্যে একটা লিডারশিপ ভাব আছে। সুমনা তার সাথে তাল মিলিয়ে অত লম্বা লম্বা পদক্ষেপে চলতেই পারে না। তাই তিন মহিলার পিছে পড়ে যাচ্ছে বারবার। তবে বিদেশ-বিভূঁয়ে বাংলা কথা শুনলেই মনে হয় কর্ণ কুহরে মধুর বাণী এসে পড়ল । তাই তার খুব ভাল লাগছে।সুমনা তাদের গল্প শুনতে শুনতে হাঁটছে। নিজেদের কথায় মহিলারা ভীষণ মশগুল। তারা তিনজন বান্ধবীও হতে পারে।
কিন্তু হেঁটে হেঁটে তাদের গন্তব্য যে সুমনার মতই হবে, সেই শহরের শেষ মাথায় অবস্থিত ওই বাঙালি কাপড়ের দোকানের কাছে, তা সুমনা বুঝতে পারেনি। তাদের গল্প শুনতে ওর ভীষণ ভালো লাগার আরেকটা কারণ, ঐ ছেলে গলার জয়ার কপিকে দেখে। কলেজের এই দ্বিতীয় পিস জয়াকে দেখে বারবার অবাক হচ্ছে। কন্ঠই শুধু নয়, এরও ব্যক্তিত্বে হুবুহু মিল পাচ্ছে জয়ার সাথে । অদ্ভুত লাগছে এই ভেবে যে, এই তিন জনের মাঝে দুজনেই তার পূর্ব পরিচিতদের ডুপ্লিকেট কপি।
এরকম মিল কেন আজ তার পাশে এসে পড়ল?
জানে না এবং এ নিয়ে তখন সুমনা তেমন একটা মাথাও ঘামায় নাই।


পিশাচ বা ডাইনিরা সবার রূপ ধারণ করতে পারে বলে সে একবার শুনেছিল। কিন্তু তা বলে কোন মানুষকে পরিচিত কারো সাথে মিল আছে দেখে পিশাচের মাসতুতো ভাই মনে করা তো অন্যায় হবে। এমন চিন্তা থেকে নিজেকে বিরত রেখেই সুমনা তাদের সাথেই পথ চলছিল। বাংলায় গাল গপ্পো ভাল লাগছে বিধায় একটু পিছিয়ে পিছিয়ে হাঁটা, আর গল্প শোনা। এভাবে যদিও সম্ভব না, কারণ দলনেতার ভারী লম্বা শরীর। তার পায়ের কদম বেশ বড়।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখের পলকের একটু ব্যবধানে সুমনার মনে হল এদের দলনেতা যেন ৫ ফুট বেশি উচ্চতার একটা আস্ত লম্বা বেজী।
একি দেখল সুমনা ?
চোখের পলকের ব্যবধান মাত্র তো কয়েক মিলি সেকেন্ড । এক পলকে একটা অন্যরকম কিছু যেন তার চোখে পড়ে গেল? একটা বিশাল আকারের বেজী! এটা যেন ঐ মহিলার বদলে তা ভারী ভারী পা ফেলে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে।
নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সুঠাম দেহের এই মহিলার বদলে সুঠাম দেহের আস্ত একটা বেজী এলো কোথা থেকে?
এই এন্টিটি, এই বস্তুটি শেইপ শিফ্টার নাকি? একবার মানুষ আরেকবার অন্য কিছু?
নাকি ঠিক ওই সময় ওই স্থানে পোর্টাল ওপেন হয়ে ঝুপ্পুস করে মহিলার মাথার উপরে বেজী সদৃশ কোন কিছু নেমে এসেছিল ক্ষণিকের জন্য? কেনই বা আসবে?
এতগুলো প্রশ্ন মনের মাঝে ঘুরপাক খেতে খেতে দোকানের সামনে এসে তিনজন দাঁড়ালো। সুমনা তাদের পিছনে। তারপরও সবাইকে ফেলে সুমনা প্রবেশ করলো দোকানের ভেতর সবার আগে । ঈদ কালেকশনগুলো দেখতে দেখতে খেয়াল করল বেজীটা বাদে বাকি দুজন দোকানের ভেতর ঢুকেছে। কাপড় নাড়াচাড়া করছে। সুমনার এক নজরে সব কালেকশন দেখা শেষ। এবার বের হবার পালা। ভারী কাঁচ ঠেলে যেই না সে দোকানের বাইরে পা রেখেছে, কেউ যেন আকাশ বাতাস একাকার করে ভম ভম কন্ঠে বলা শুরু করলো,'এই তোমরা কোথায়? কি করছ ওখানে ? '
এত উদ্ভট স্বরে কে শব্দ করে উঠলো?
সুমনা ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকালো। দেখল, সুমনা যতক্ষণ দোকানের ভেতরে ছিল ওই বেজীটা দোকানের বাইরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। দোকানে সে প্রবেশ করেনি। সুমনা বের হতেই তাকে দেখে তার কন্ঠ সচল হয়ে উঠেছে যেন। সে ভড়ভড় করে শব্দ করে দোকানে ঢুকবার আয়োজন শুরু করছে এবার। সচল হবার সুইচ অন্ হয়ে গেছে। এগিয়ে আসছে দোকানের দিকে। গলা দিয়ে অদ্ভুত শব্দ করে তারস্বরে জানান দিচ্ছে তাকে যে এবার সে আগাতে পারে দোকানের ভেতরে থাকা বাকি দুজনের দিকে।
কিন্তু কে আটকে রেখেছিল তাকে?
আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে হঠাৎ ঠাঁয় দাঁড়ানো থেকে সচল না হলে সুমনা তার এহেন আচরণে এতটা অবাক হতো না। এতটা মনযোগও দিত না। বেজীটা যেন সুমনা বের হবার অপেক্ষায় ছিল। দোকানে প্রবেশ করার সময় গলায় কথার ভঙ্গীমায় এও জানান দিচ্ছে, যে 'তুমি যখন দোকানের ভিতর ছিলে আমি তখন ভিতরে ঢুকিনি।'
কিন্তু কেন?
সুমনা কি করেছে তার?
বেজীটা লম্বা হয়ে শিড়দাঁড়ারর ওপর ভর করে টান টান শরীর ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল দোকানের দিকে চেয়ে। বাইরে তার এই অপেক্ষা। সুমনা ভেতরে থাকলে সে ভেতরে যাবে না। কেন সুমনাকে তার প্রতিপক্ষ মনে হয়েছে? সুমনার সাথে ফ্রিকোয়েন্সি মিলেনি বলে? কেন মিলেনি? ও কি এই পৃথিবীর আট দশটা মানুষের মত সত্যিকারের মানুষ না। নাকি প্রেতলোকের ডাইনী?


বেজীটাকি সত্যি চোখের ভুল ছিল? নাকি সত্যি মানুষরূপে ঘুরে বেড়াতে এসেছিল মাটির ওপর কিছুক্ষণের জন্য? তার বাকি দুই সংগী তো কাকতালীয় ভাবে সুমনার পূর্ব পরিচিতদের কপি। তাহলে অতীতের সেই দুজনাও কি এদের গোত্রের? হাব ভাবে তো সেই দু’জনও সুবিধার ছিলনা কোনদিন।
আজ, দৃপ্ত পদভরে যে হেঁটে এতটা পথ সুমনার সাথে আসতে পারে তার এমন কি হলো? তার দোকানে প্রবেশ করতে কেন এত সংকোচ শুরু হলো?


সুমনা যতক্ষণ দোকানের ভেতরে ছিল বেজীটি সেখানে প্রবেশ করেনি। ঠিক যখনই সুমনা বেরিয়ে আসলো সে খলবল করা শুরু করলো। বলতে লাগলো , ‘কি এত দেখে মেয়েগুলো? কি করছে ওখানে?' দোকানের ভারী কাঁচের দরজা টেনে দোকানে ঢুকছে আর বলেই চলছে একই কথা।
বেজীর এহেন কান্ড দেখতে দোকানে প্রবেশ করতে চেয়েছিল সুমনা। কিন্তু এক অজানা আশঙ্কায় দোকানে আর প্রবেশ করেনি। কেমন যেন অস্বস্তি ভর করে বসেছিল।
ডাইনীরা সবকিছুর রূপ ধারণ করতে পারে। তিনজনের এই দলে দুজন সুমনার পূর্ব পরিচিতদের রূপে এসেছে। তারা সবাই হয়তো বা পিশাচ লোক থেকে আগত মানুষরূপি পথচারী জাতীয় কিছু। বাকি দুই সঙ্গীর সাথে পথ ধরে ধরে হেঁটে চলছে মানুষ রূপে। আর ঠিক তখনই সেই পথে এসে পড়েছে সুমনা। চোখের কোন এক পলকে সুমনার কাছে এড়াতে পারেনি তার আসল রূপ। সে জানে সুমনা তাকে দেখে ফেলেছে। তার চেহারা প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় সে দোকানের ভেতর প্রবেশ করেনি। আর সুমনার সামনে আসে নি।
এবার যেভাবেই হোক পালাতে হবে।
কিন্তু কিভাবে পালাবে এর সামনে থেকে?
হয়তোবা কিছুক্ষণ মানুষরূপে হেঁটে যাবে ওই রাস্তা ধরে। তারপর কোন এক সময়ে বাতাসে মিলিয়ে যাবে লোক চক্ষুর আড়ালে।

০৭/০৯/২০২৬
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৮
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সর্বজনীন পেনশন: সুবিধা বাড়ছে, ভবিষ্যৎ কতটা নিশ্চিত ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:৪৪


সরকারের মনোভাব সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। ফ্যাসিস্ট আমলের বিতর্কিত 'সর্বজনীন পেনশন' প্রকল্পটি বাতিল না করে বর্তমান সরকার উল্টো নতুন নতুন স্কিম চালু করছে এবং এর সুযোগ-সুবিধা দিন দিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তান কি বাংলাদেশে জঙ্গি নেটওয়ার্ক গড়ছে?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৫৪


পাকিস্তানের জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়বার সহযোগী সংগঠন জামাত-উদ-দাওয়ার কয়েকজন নেতা দাবি করেন, হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই জঙ্গি সংগঠনটির নেতা সাইফুল্লাহ কাসুরি বলেন, তারা ১৯৭১ সালে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অচেনা মাটিই আমার শেষ ঠিকানা !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৫১

অচেনা মাটিই আমার শেষ ঠিকানা !



পাথর বা গ্রানাইটে বেঁধো না তো আমার শেষ শয্যা,
নাম খোদাই করে রেখো না আমায়, দিতে একা থাকার লজ্জা।
চাই না উপাধি, চাই না তারিখ, ধূসর... ...বাকিটুকু পড়ুন

নৈতিক অবক্ষয়ের দায় কার?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৫২

ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের দায় কার?

সমাজে যখন অপরাধ বাড়ে, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়, সন্তান বাবা-মাকে সম্মান করে না, মানুষ মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারায়, দুর্নীতি-প্রতারণা-সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে- তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কাতুকুতু'র কাহিনীনামা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭

কাতুর সাথে কুতু দিয়ে হচ্ছো পগারপাড়,
ফের যদি আসো কাছে বলবো- 'খবরদার!'
একটু হেসে, কাছে এসে, দিচ্ছো বুঝি কাশি,
ঝুলিয়ে দাড়ি, যাচ্ছো বাড়ি, যেথায় আছেন মাসি।

তোমার সাথে, দুধে-ভাতে, গপ্প করছি কত,
তবু কেন, ঘন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×