somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ আমার সোনা জান পাখি!

২৬ শে ডিসেম্বর, ২০১৮ সকাল ৮:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ছুরিটা অনেকক্ষন ধরে ধার দিচ্ছি। ধারটা কিছুতেই পছন্দ মতো হচ্ছে না। আমার আরও ধার দরকার। ব্লেড দিয়ে সহজে মোম কাটার মত ধার দরকার আমার। ঘষতে ঘষতে হাতটা ব্যথা করছে, অনেকক্ষন ধরে ঘষছি সেজন্য মনে হয়। মাঝে মাঝে অনেক কিছু সহ্য করে নিতে হয়। ধার দেয়ার কাজ শেষ করে একটা ভাল করে ঘুম দিতে হবে। বাসায় রিলাক্সিন ট্যাবলেটের একটা পাতা থাকার কথা। একটা ট্যাবলেট খেয়ে তারপর ঘুম দিতে হবে। নার্ভ ঠিক রাখার জন্য ঘুমের চেয়ে ভালো কিছু হয় না। আমার এখন দরকার ঘুম, গভীর ঘুম…….

এক
প্রায় দুই মাস আগের কথা। ডিজিটাল যুগে কত কিছুই না সম্ভব! কিছু দিন আগেও এসব কিছু চিন্তাও করতে পারতাম না। ইন্টারনেটে এটার এ্যাড দেখে আমি তো অবাক! এরকম একটা সার্ভিসই তো আমি এতদিন থেকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। মোবাইল সিমের ক্লোন এ্যান্ড কল রেকর্ড মেশিন। কি দারুন ইনভেনশন! Complete solutions to all my problems! সারা দিনের ওই একটা সিমের সমস্ত কথপোকথন অটোমেটিক রেকর্ড হয়ে থাকবে। দাম একটু বেশীই পরবে, তাতে কি? যেই সার্ভিস দেবে তার তুলনায় এটা কোন টাকাই না। মেসিনটা একটা বড় ব্রীফকেসের মতো। চাইনিজ মাল। এই চাইনিজরা না থাকলে আমাদের মতো থার্ড ওয়ার্ল্ডের লোকজনের যে কি হতো?

একটা অনলাইন UPS কিনতে হয়েছে ২৪ ঘন্টা পাওয়ার সাপ্লাই দেবার জন্য। মেসিনটা রেখেছি আমার অফিস ডেস্কের নীচে। অ্যান্ড্রয়েড বেসড সফটওয়ার। পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড। প্রতিদিন অফিসে দুপুরের খাবারের পর, ওয়াইফাই দিয়ে কানেক্ট করে, জমান ফাইল গুলি কানে ওয়াকম্যান লাগিয়ে, খুব মনোযোগ দিয়ে শুনি আমি। আর প্রয়োজনীয় ডাটা গুলি একটা ডায়েরিতে লিখে রাখি….

দুই
বিল্ডিংটার নীচে পৌঁছালাম কাঁটায় কাঁটায় এগারটার সময়। সিড়ি দিয়ে উঠার আগে হাত ঘড়িতে সময় আবার মিলিয়ে নিলাম। সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাতে পিজা হাট থেকে হোম ডেলিভারি দেয়া বড় একটা পিজা। ডেলিভারি ম্যানের কাছ থেকে নগদ টাকা দিয়ে নীচ থেকে বুঝে নিয়েছি। কি সাইজ আর কি ধরনের পিজা অর্ডার দেয়া হয়, সেটা আমার মুখস্ত। হাতে পিজার প্যাকেট আর কাঁধে ঝুলান একটা বড় ব্যাগ নিয়ে আস্তে আস্তে আমি পাঁচ তলায় উঠে আসলাম। একটাই ফ্ল্যাট। পাশে খোলা ছাদ। দরজার সামনে দাড়িয়ে কাঁধের ব্যাগটা খুলে কাজের একটা জিনিস হাতে নিলাম। সুইডিশ BAHCO কোম্পানির দশ পাউন্ডের একটা হ্যামার। বিদেশী জাহাজের মাল। দুই সপ্তাহ আগে চট্টগ্রামে অফিসের কাজে গিয়েছিলাম। ফৌজদার হাটের জাহাজ ভাঙ্গা জিনিস বিক্রির দোকান থেকে এটার সাথে আরও কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস একবারে কিনে নিয়ে এসেছি। পিজার প্যাকেটের নীচে হ্যামারটা ধরে কলিং বেল দিলাম বাসায়। কোন পিপ হোল নেই। গতকালকে এসে দেখে গিয়েছিলাম। চার তলার একটা ফ্ল্যাটে ভাড়া দেয়া হবে নোটিস দেখে, বেশ ভালো করে বাসাটা দেখে আর বাড়িওয়ালার সাথে বিল্ডিং এর বাকি বাসা গুলি কেমন তা শুনে গিয়েছিলাম। সব গুলি ফ্ল্যাট একই রকম। ছোট বাসা, তিন রুম। একটু পরেই দরজার ওপাশে পায়ের শব্দ শুনলাম।
-কে? বেল দিয়েছে কে?
-পিজা ডেলিভারি। এই বাসা থেকে কি কোন পিজার অর্ডার দেয়া হয়েছিল?
কথা অতিশয় সত্য। পিজা হাটে ফোনে অর্ডার দেয়ার কথা আমি নিজ কানে কল রেকর্ড মেসিনে শুনে এসেছি।
-ও আচ্ছা। একটু অপেক্ষা করুন।
দরজাটা খুলে একটা ছেলে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। পারফেক্ট! ঠিক এই ছেলেটাকেই আমি খুঁজছিলাম। একে আমি চিনি, বেশ ভালো ভাবেই চিনি। এর সম্পর্কে আমার ডায়েরিতে কমপক্ষে পনের পাতা লেখা হয়েছে। ফোনের কথোপকথন ছাড়াও দূর থেকে একে আমি বেশ কিছুদিন ফলো করেছি প্রয়োজনীয় ডাটার জন্য। পিজার প্যাকেটটা বড়। দরজা আরও খুলতে হবে ছেলেটাকে এটা ভিতরে নেবার জন্য! পুরো দরজা খুলে ছেলেটা পিজার প্যাকেটটা বাম হাতে নিচ্ছে আর ডান হাত শার্টের পকেটে টাকা দেবার জন্য ঢুকিয়ে, চোখ আমার উপর থেকে সরাতেই আমি মুহুর্তের মধ্যে হ্যামারটা দিয়ে ছেলের মাথায় সাইডে জোরে একটা বাড়ি দিলাম। কাটা কলাগাছের মতো ছেলেটা কোন শব্দ করার আগেই মাটিতে পড়ে গেল। এই এ্যাকশনটা আমি কম করে হলেও একশ বার প্র‍্যাকটিস করেছি। Practice makes a man perfect! আমার বেলায়ও তাই হলো। মাথার কোন সাইডে বাড়ি দিলে সব চেয়ে তাড়াতাড়ি কাজ হয় সেটা ইউটিউবে দেখেছিলাম। Professional Advice কখনই ভূল হয় না। চুপচাপ ঘরে ঢুকে দরজা আগে ভালো করে লাগিয়ে দিলাম। কাঁধের ব্যাগ থেকে দুইটা রশি বের করে ছেলেটার হাত আর পা আলাদা আলাদা করে বেঁধে ফেললাম। আজকের জন্য নিজের হাতে স্পেশাল দুইটা জিনিস বানিয়েছিলাম ইউটিউব দেখে। বড় একটা কাপড়ের দুই প্রস্থের মাঝখানে একটা প্লাস্টিকের বল। বল সহ এক প্রস্থ কাপড় ছেলেটার মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে মাথার পিছনে ভালো করে বেঁধে দিলাম। এটার কাজ শেষ। টু শব্দও করতে পারবে না প্লাস্টিকের বলটার জন্য। কাঁটায় কাঁটায় পাঁচ মিনিট লাগল। আমি নিজেই এত দারুন পারফরমেন্সে মুগ্ধ।
-কি ব্যাপার? এত সময় লাগে একটা পিজা নিতে? তাও ফোনে অর্ডার দিলাম আমি? কোন সমস্যা হয়েছে?

নারী কন্ঠের আওয়াজ শুনে আমি ব্যাগটা হাতে নিয়ে বেড রুমে ঢুকলাম। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি পড়া একটা মেয়ে বেডে উপুড় হয়ে শুয়ে মোবাইল দেখছে। ঘরে হিন্দী সিনেমার গান বাজছে। হিন্দী গান একদম আমি পছন্দ করি না। মেজাজটা সাথে সাথেই খারাপ হয়ে গেল। তারপরও মেজাজ কন্ট্রোল করে বললাম-
-না, কোন সমস্যা হয়নি। আমার সোনা জান পাখি, তুমি কি এখন পিজা খেতে চাচ্ছ? চাইলে বল, বাসায় যেভাবে সাইজ করে কাটি, সেভাবেই পিজাটা কেটে দেই?

ছোট বেলায় নানী দাদীর কাছে শুনেছিলাম, ভূত দেখলে নাকি মানুষ ভয়ংকর ভাবে চমকে উঠে আর ঠাঠা মাথায় পড়লে নাকি মানুষ পাথর হয়ে যায়! শীমু আমার কন্ঠ শুনে বেড থেকে লাফ দিয়ে নামল আর আমাকে চোখের সামনে দেখে, একই সাথে দুইটা ঘটনাই ঘটাল। চমকে উঠে প্রায় স্থানু হয়ে আমার কাছ থেকে প্রায় সাত হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ওর প্রায় বিস্ফোরিত দুইটা চোখ দেখে মনে হলো, এখনও আমাকে দেখে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না! ওকে বিশ্বাসের মর্ত্যে আসার জন্য কিছুটা সময় দিলাম আমি।
-এই রকম পাগলের মতো তাকিয়ে আছ কেন? আগে আমাকে দেখো নি কখনো?
-শোয়েব, আমি ভূল করেছি, বিরাট ভূল করেছি। আমাকে এই বারের মতো মাফ করে দাও!
-When you continue to repeat a mistake, it's not a mistake anymore, it is a decision. তুমি যা করে বেড়াচ্ছ, সেটা জেনে শুনেই করেছ, অনেকদিন ধরেই করছ। কাজেই এটা একটা সিদ্ধান্ত, ভুল না। সুতরাং ভূল বলে অযথা নিজের দোষ আর অপর্কম ঢাকার চেষ্টা করে এখন আর কি লাভ?
নিস্পলক দৃষ্টিতে আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে শীমু জিজ্ঞেস করল-
-তুমি রবিনকে কি করেছ?
আমি আমার সর্বোচ্চ চেস্টা করে মিষ্টি মধুর একটা হাসি উপহার দিলাম শীমুকে। আমার সাত মাসের বিয়ে করা বউ আমার সেই হাসি দেখে সাথে সাথেই বুঝে ফেলল ঘটনা খারাপ। প্রায় দৌড়ে সদর দরজার দিকে যেতে চাইল। আমি ঠিক এটাই চাইছিলাম। ব্যাগ থেকে ইতিমধ্যেই সাদা একটা রুমাল বের করে হাতে নিয়েছি। আমার পাশ দিয়ে যাবার সময় পিছন দিক থেকে শীমুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নাকে রুমালটা চেপে ধরলাম। সিএনজি ট্যাক্সিতে এখানে আসার সময় এই রুমালে কিছুটা ক্লোরফর্ম ঢেলে নিয়েছিলাম। রুমালটা ক্লোরফর্ম দিয়ে ভিজে গিয়েছিল দেখে ভাঁজ করে এয়ারটাইট প্যাকেটে ভরে ব্যাগে রেখেছিলাম। অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলেই এটার ইফেক্ট নষ্ট হয়ে যায়। এখন দেখি শুকিয়ে গেছে কিন্তু এতেই আসল কাজ হয়ে যাবে। মাত্র তিন মিনিট লাগল শীমুর নিরবতার জন্য। হাল্কা ধস্তাধস্তি করল আমার সাথে ছুটার জন্য, তবে বেশি উত্তেজনায় এর ইফেক্ট বেশ তাড়াতাড়িই হলো, ইন্টারনেটে পেয়েছিলাম প্রায় পাঁচ মিনিটের মতো লাগে পুরোপুরি অজ্ঞান করতে। তারপর আরও এক মিনিটের মতো রুমালটা শীমুর নাকে হালকা করে চেপে ধরে রাখলাম। এটাই আসল কাজ করে দেবে। ইউটিউব খুব কাজের জিনিস। সব কিছু শেখা যায় এখান থেকে। কোলে করে ওকে এনে বেডে শুইয়ে দিলাম। হাজার হোক বউ তো! ঘড়ি দেখলাম, এগারটা বেজে আঠারো মিনিট। পারফেক্ট! হাতে সময় পাবো মিনিমাম ২৫ মিনিট। এবার আসল কাজ শুরু করার পালা………

তিন
প্রকৃতি কখনোই প্রতারণাকে প্রশ্রয় দেয়া না আর সত্যকে কখনোই অনন্তকাল গোপন করে রাখা যায় না। শীমুর এই অবৈধ সম্পর্কের সময়ও ঠিক তাই হলো। ও যে আমার সাথে এত বড় প্রতারণার আশ্রয় নেবে, সেটা আমি প্রমান না পেলে চরম দুঃস্বপ্নের মধ্যেও চিন্তা করতে পারতাম না।

অফিস থেকে একদিন বাসায় ফেরার সময় আপেল কিনে ফিরলাম। সন্ধ্যার সময় বাসায় এসে দেখি ড্রয়িং রুমে টিভিতে স্টার প্লাস ছেড়ে শীমু খুব মনোযোগ দিয়ে একটা সিরিয়াল দেখছে। ড্রেস চেঞ্জ করে সোফায় বসে কয়েক বার বললাম আপেল গুলি ধুয়ে কেটে আনতে। পাত্তাই দিল না আমার কথা। কি গভীর মনোযোগ টিভির দিকে! নিতান্তই বাধ্য হয়ে কিচেনে গেলাম আমি। পারতপক্ষে কিচেনে ঢুকি না আমি। মনে প্রানে আমি বিশ্বাস করি এটা হলো সম্পূর্ন মেয়েদের জায়গা। কোথায় কি আছে সেটাও জানি না। আঁতি পাঁতি করে সব জায়গায় ফ্রুট কাটারটা খুঁজছি। চুলার নীচের কিচেন ক্যাবিনেটের দরজা খোলার পর মনে হলো ইঁদুর দৌড়াদৌড়ি করার শব্দ শুনলাম। সবচেয়ে নীচের তাকের ডেকচি হাড়ি পাতিল সরিয়ে ইঁদুরটা বের করার চেস্টা করছি। একদম ভিতরের দিকে একটা মাটির হাড়ি দেখে সেটা বের করে আনলাম। ঢাকনা অর্ধেক খোলা দেখে ভিতরে কি আছে ভালো করে তাকাতেই আমি অবাক হয়ে গেলাম। একটা প্রায় নতুন টাচ স্ক্রীন মোবাইল! এটা এখানে কেন? এটাতো আমি কিনিনি। গত মাসেই শীমুকে স্যামসাং জে৭ এর একটা নতুন মোবাইল কিনে দিয়েছি। এটা তো সেটা না। এটা কোথা থেকে আসল? বাটন চাপ দিয়ে দেখলাম বন্ধ। মনে কেন জানি সন্দেহ জাগল! এখন অন করলে পাশের রুমে শব্দ যাবেই আর শীমু শুনে ফেলবে। পিছনের ঢাকনা খুলে দেখলাম এয়ারটেলের সিম ভরা। আমি আর শীমু দুইজনই গ্রামীন আর রবির সিম ব্যবহার করি। শীমুর বাসায় সবাই রবির সিম ব্যবহার করে। এয়ারটেলের সিম কি কাজে লাগে তাহলে? মাথা ঠান্ডা রাখলাম। না জেনে, না দেখে শীমুকে কোন প্রশ্ন করা যাবে না। পরে নিজেই ছোট হয়ে যাব। ঠিক আগের জায়গায় আগের মতো সবকিছু রেখে দেয়ালে ঝুলান একটা ছুড়ি নিয়ে চলে আসলাম। রাতে ঘুমানোর আগে এটা নিয়ে কোন কথাই তুললাম না। আগে নিজে ভালো ভাবে চেক করে দেখে নেই………..

মধ্য রাতে ছোট বাথরুমে যাবার চাপ উঠতেই বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে গেলাম। ফেরার সময় মোবাইলটার কথা মনে পড়ল। তাকিয়ে দেখি শীমু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। খুব সাবধানে বেডরুম থেকে বের হয়ে কিচেনে চলে এলাম। লাইট না জ্বালিয়ে ক্যাবিনেটের দরজা খুলে হাত দিয়ে জিনিসটা বের করে আনলাম। মনের ভিতরে খুঁত খুঁত নিয়ে শান্তিতে ঘুমান যাবে না। ড্রয়িং রুমে এসে সোফার একটা কুশনের চেইন খুলে ফেললাম। আমি এমনিতেই খুব ঠান্ডা মাথার মানুষ, শুধু শুধু হইচই করা আমার কোন কালেরই অভ্যাস না। মোবাইলটা কুশনের ফোমের ভিতরে ঢুকিয়ে অন করলাম। বাহ, বেশ ভালো বুদ্ধি! খুব হালকা একটা শব্দ শুনলাম অন হবার। একটা ভয় কাজ করছিল, পাসওয়ার্ড দেয়া আছে নাকি? তাহলেই সর্বনাশ! কুশনের ভিতর থেকে বের করে এনে দেখি, নাহ, পুরো ওপেন হয়ে গেছে। মনে হয় কল্পনাও করেনি এটা আমি খুঁজে পাব। ভলিউম মিউট করে দিলাম প্রথম। স্ক্রীনে আমার জান পাখিটার বেশ সুন্দর একটা ছবি। হুম, এটা তাহলে শীমুরই। এভাবে লুকিয়ে রাখল কেন? ফোনের কল লিস্ট বের করে আমি হতভম্ব! শুধু মাত্র একটা নাম্বারে সব কল, ইনকামিং আর আউটগোয়িং। লাস্ট কলের ডিউরেশন দেখে মাথা খারাপ অবস্থা আমার, প্রায় ৪০ মিনিট। আমি ফোন দিলে পাঁচ সাত মিনিট পরেই বলে মোবাইলে বেশিক্ষন কথা বললে নাকি মাথাব্যথা করে! এই নাম্বার কার, যার সাথে এতক্ষন কথা বলেছে? এটা বন্ধ করে কনট্যাক্ট লিস্টে গেলাম। এখানেও মাত্র একটা নাম্বার তবে কোন নাম নেই। এখান থেকে কল হিসট্রী খুলে দেখলাম, এটাই সেই নাম্বার। এটা কার নাম্বার? এখন কিছুটা উত্তেজনা বোধ করছি। তাড়াতাড়ি মেসেজ ওপেন করলাম। এখানেও একই কান্ড। একই নাম্বার দিয়েই সব কিছু। হাত কিছুটা কাঁপছে এখন। লেটেস্ট মেসেজটা ওপেন করলাম, ইনকামিং। এটা পড়ার পর পাগলের মতো আমি কমপক্ষে আরও ৫০টা ইনকামিং আর আউটগোয়িং মেসেজ পড়লাম। সব কয়টার একই থীম! হায় খোদা, কেন পড়লাম আমি এইগুলি? কেন কেন কেন? ভালোভাবে নিশ্বাস নিতে পারছি না। বুকের বাম পাশে প্রচন্ড ব্যথা করছে, ডান হাত দিয়ে বুকটা চেপে ধরলাম। তীব্র আক্রোশে দুই হাত দিয়ে নিজের সব চুলগুলি টেনে ধরলাম। অসহ্য কষ্ট আর তীব্র বেদনা আমার হৃদয়টাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়ে ফেলছে। ঠিক সেই মুহুর্তে মনে হলো পৃথিবীতে প্রতি মুহূর্তে কত শত মানুষ, কত না কত ভাবে মৃত্যু বরন করে, অথচ আমার কেন মরন হয় না? আমার অব্যক্ত কষ্টের অনুভুতি গুলো যেন দুই চোখ দিয়ে অবিরত জল হয়ে বের হয়ে এসে আমার গেঞ্জিটা ভিজিয়ে ফেলছে। কতদিন ধরে এই জঘন্য অপকর্ম চলছে আমি জানি না। নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীকে আরেকটা ছেলের সাথে লুকিয়ে লুকিয়ে দিনের পর দিন এই রকম শারীরিক সম্পর্ক করতে শুনা, তাদের অকুন্ঠ জৈবিক আনন্দের তীব্র অনুভূতির এই মেসেজ গুলি পড়ার চাইতে মরনও অনেক ভালো! আমি সত্যই আমার ইচ্ছে মৃত্যু চাই!

চার
শীমুর সাথে আমার ভালোবাসার স্মৃতি গুলি মনে পড়লে আমি এখন শিউরে উঠি। এখন সেই স্মৃতি গুলি আমার বুকে আগের মতন শীমুর কোমল পাদুকার পেলব স্পর্শ এঁকে রিমি-ঝিমি হেঁটে যায় না বরং বুকের মাঝখানে তছনছ করে একটা সুনামি আমার নিরীহ আর অসহায় ভালোবাসাকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে যায়। হৃদয়ের আজ এই অসহায়ত্ব অবশ্যই আমার পাওনা নয়। আমার এই কষ্টের জন্য কাউকে না কাউকে শাস্তি পেতেই হবে। বিনা যুদ্ধে নাহি দেব আমি সুচাগ্র মেদিনী……..

আমার বুকের গভীরে এই জঘন্য প্রতারণার কথাগুলি মনে পড়লে এখন আর সেগুলি আমার দুই চোখের অশ্রু হয়ে আজ গড়িয়ে পড়ে না। প্রচন্ড ক্রোধে আমি মাঝে মাঝে চিৎকার করে উঠতে চাই। অবাক হয়ে শুধু ভাবি, কতটা নির্মম অত্যাচার আমার এই মনের উপর তুমি করেছ, শীমু? আমি তো শুধুই তোমাকে আমার সবটুকু দিয়ে ভালোবাসতে চেয়েছি, আমার নিস্তব্ধতার সঙ্গী করতে চেয়েছি। যদি আমাকে নাই ভালোবাসতে, তাহলে চলে যেতে! কেন এই প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে আমাকে এত বড় ধোকা দিলে? কেন আমাকে এত বড় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিলে? এত বড় প্রতারণা বিনা শাস্তিতে ছেড়ে দেয়া যায় না, অবশ্যই না। এই পৃথিবীর সমস্ত মেয়েদের প্রতি আমি আজ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। আমি আর কোনদিনও অন্য কোন মেয়েকে ভালোবাসতে পারব না। আমার এত সাধের এই জীবনটা আমার কাছে আজ নিতান্তই মূল্যহীন। এই জীবনে এতটা নিঃস্বার্থ ভাবে, নিজের সব কিছু উজাড় করে ভালোবেসেও যখন আমার জান পাখিটাকে আমার করে পেলাম না, তখন আর কি করার……..

পাঁচ
আমার কত আদরের সোনা জান পাখি! কত সখ করে আমার ঘরে নিয়ে এসেছিলাম! কত্ত ভালোবাসি আমার জান পাখিটাকে আমি! বুক থেকে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো হাহাকারের সাথে। আমার মন এই কয়দিনে এদের কথোপকথন শুনতে শুনতে পাথরের চেয়েও শক্ত হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে নিজেই অবাক হয়ে যাই, কিভাবে আমি এত বড় প্রতারণা সহ্য করে থাকছি। কখনো কখনো জীবনে এমন হয়, যে মানুষটাকে আমরা পাগলের মতো ভালোবাসি, সেই মানুষটা গোপনে হয়ে যায় অন্য কারো! বড় তীব্র সেই ভালোবাসা, বড় তীব্র সেই আবেগ আর স্বপ্নের পিছুটান। তবুও আবেগ কাটে, আবেগ ভাঙে... সেই খুব ভালোবাসার মানুষটিও নোংরা ভাবে একদিন ঠিক ঠিক পর হয়ে যায়। এতটা পর, যে একসময় সহস্র দূরত্বেও আর বুকে ব্যথা লাগে না। এক বিন্দু অশ্রুও জমে না চোখের কোনো কোণে। সত্যিই কি কষ্ট হয় না? নাহ, এক বিন্দুও না! আর হয়না বলেই হয়তো দাঁতে দাঁত চেপে আমি এই কয়েক মাস এদের সমস্ত কথোপকথন খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে গেছি।

আমি জানতে চেয়েছি কেন আমি হেরে গেলাম? কবে থেকে হেরে গেলাম? ধৈর্য্য তিক্ত হলেও এর ফল মধুর হয়। ধীরে ধীরে সব কিছু আমি জেনে গেলাম। ইচ্ছে করেই প্রায়ই শীমুকে জানাতাম আমি ঢাকার বাইরে অফিসের কাজে যাচ্ছি, ফিরতে রাত হবে। তারপর অফিসে বসে সব শুনতাম। এদের বিকৃত রুচির আবেগ আমার ভেতরটা যেন খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলত। হৃদয়ের সেই রক্তক্ষরন আমি প্রত্যেকটা ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে পারতাম, তরল একটা রক্তলাল যন্ত্রনা মস্তিষ্ক হয়ে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ত। তবু আমি নিজেকে শক্ত করে আমার যা যা জানার দরকার, সেগুলি একটা ডায়েরিতে লিখে রাখতাম।

শীমুর সাথে এই ছেলের (রবিন) শারীরিক সম্পর্ক আমার সাথে বিয়ের আগে থেকেই ছিল। হুট করে এই ছেলে বিদেশে চলে যাওয়ায় শীমুর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে। ওর বাসা থেকে যখন আমার সাথে বিয়ের প্রস্তাব দেয় তখন ওর কোন উপায় ছিল না রাজি না হবার। ওকে দেখে আমার এতই ভালো লেগেছিল প্রথমবার যে, ও যাই বলত আমি সেটাই সরল মনে বিশ্বাস করতাম। বিয়ের আগে কোন ছেলের সাথে কোন রকম সম্পর্ক আছে নাকি জিজ্ঞেস করেছিলাম বিয়ের আগে। বেমালুম অস্বীকার করে উল্টো আমাকেই বাজে কথা বলল ওর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য। ওকে যে আমার খুব করে পছন্দ হয়েছে, সেটা কিভাবে যেন টের পেয়ে গিয়েছিল। বিয়ের পরের দিনই হানিমুনে ওকে কক্সবাজারে নিয়ে গেলাম। নতুন সুন্দরী বউ, কিযে সেই অনুভূতি! প্রথমবার শারীরিক সম্পর্কের পর শীমুর ভার্জিনিটি নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় পড়ে প্রশ্ন করতেই মুহুর্তের মধ্যেই বলল, ছোট বেলায় উঁচু আম গাছ থেকে আম পারতে যেয়ে পড়ে গিয়েছিল। সেজন্যই এই অবস্থা। আমার এটা সম্পর্কে তেমন কোন ধারনাই ছিল না। ও যখন এই কথা গুলি বলছিল, তখন ও আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার বুকে মাথা রেখে শুয়েছিল হোটেলের বেডে। এত অন্তরঙ্গ মুহুর্তেও কেউ যে মিথ্যা কথা বলতে পারে সেটা আমার মাথায়ও আসে নি। আজ সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি কত বড় ভূল আমি করেছি! ছেলেটা আমার বিয়ের চার মাস পরে দেশে আবার ফিরে আসে আর আসার পরেই শীমুর সাথে যোগাযোগ করে। পুরানো চাল যেমন ভাতে বাড়ে, পুরানো প্রেমিককে দেখে শীমুর মাথায় আবার আগের আবেগ চড়ে বসল। একটা বারও আমার কথা ভাবল না। লুকিয়ে লুকিয়ে এই অবৈধ অনৈতিক সম্পর্ক চালিয়ে গেল। এই মেয়ের বুকে কি কোন ভয় ডর নেই? এতটা ডেস্পারেট কিভাবে হলো? আমি এই সম্পর্কের কথা জানার পর থেকে ওর সাথে শারীরিক সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ করে দিলাম। এটা রুচির ব্যাপার। এতটা নীচে আমার পক্ষে নামা সম্ভব না। যেই শরীর ও আরেকটা ছেলেকে দিয়ে আসত, সেটা স্পর্শ করতে আমার প্রচন্ড ঘৃণা লাগত। বিভিন্ন ছুতা দেখিয়ে আমি দেরী করে ঘুমাতে আসতাম। শীমুও কিছু বলত না, ওর চাহিদাও থাকত না, কারন সেটা ও আগেই পূরন করত ছেলেটাকে দিয়ে। রাতের পর রাত নিজের সব চাহিদা আমি গলা টিপে হত্যা করে নিজের বুকেই কবর দিয়ে উল্টো দিকে ফিরে বেডে শুয়ে থাকতাম আর মনের ভিতর একটা বিশেষ দিনের প্ল্যান বানাতাম আর সেটা টিউন করতাম যেন সব চেয়ে ভয়ংকর শাস্তি ওকে দেয়া যায়!

তিন দিন আগে ফোনের রেকর্ডে যখন শুনলাম শীমু আমাকে নপুংশক বলে গালি দিচ্ছে, তখন আর নিজেকে বেঁধে রাখতে পারলাম না। অনেক জল ঘোলা হয়েছে, অনেক ঋন জমে গেছে, এখন সময় এসেছে সব কিছু কড়ায় গন্ডায় ফেরত দেবার…….

ছয়
আধা ঘন্টা পর শীমুর সেন্স ফিরে আসা শুরু করল। জগ থেকে ওর মাথায় হাফ জগ পানি ঢেলে দিলাম। চোখ খুলে আমার দিকে তাকাল। চেয়ার থেকে উঠার চেস্টা করতেই বুঝল লাভ নেই। শীমু আর রবিনকে আমি পাঁচ হাত ব্যবধানে দুইটা কাঠের চেয়ার বসিয়ে হাত পা ভালো করে বেঁধে রেখেছি এবং মুখে একই ভাবে বল ঢুকিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছি। এত দিন আমি এদের অনেক, অনেক কথা শুনেছি। আজ আমার পালা! শীমু সজ্ঞান আর রবিন এখনও অজ্ঞান। আমি শীমুর সাথেই প্রথমে কথা বলতে চাই।

-শীমু, গত তিন মাস ধরে তোমরা যা যা করে বেড়িয়েছ আমি তার সবটুকুই জানি। তোমার কিচেনে লুকিয়ে রাখা মোবাইলটার কথাও আমি জানি। ঐ সিম দিয়ে তুমি যা বলতে, শুনতে, মেসেজ পাঠাতে সবগুলির আমি রেকর্ড করা কপি পেতাম সিম ক্লোন করার মেশিনে। আজকে শুধু তোমাকে শুনানোর জন্য আমার মোবাইলে সেই গুলি কপি করে এনেছি। নাও শুনো, আজকে সকালে রবিনকে ফোন করে কি বলেছ?

মাথা নীচু করে শীমু কল রেকর্ড শুনল। ওর মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো নিজের কানকে ও বিশ্বাস করতে পারছে না। এরপর আমি বেছে বেছে ওকে ওদের কিছু কুৎসিত নোংরা কথাবার্তা শুনালাম। সব শেষে শুনালাম সেটা, যেটাতে ও আমাকে নপুংশক বলে গালি দিচ্ছে। চুপ করে এটাও শুনল শীমু।
-আমি নপুংশক নই শীমু। এইসব কিছু জানার পর তোমাকে স্পর্শ করতে আমার ঘৃনা করত। সেই জন্য তোমার কাছে আসতাম না।
-প্রতিটা মানুষের একটা সহ্য করার ট্রীপিং পয়েন্ট থাকে। তুমিই আমাকে এই ট্রীপিং পয়েন্ট ক্রস করিয়েছ। সুতরাং এখন থেকে যা হবে তার জন্য তুমিই একমাত্র দায়ী।
-যেই পরিমান কষ্ট দিয়ে আমাকে তুমি ঋণী বানিয়েছ, সেটা আমি কখনই শোধ দিতে পারব না। তবে আজকে কিছুটা হলেও ফেরত পাবে তুমি। তোমার সামনে বসা ছেলেটার জন্যই তো এত কিছু করেছ তাইনা, তাহলে একে দিয়েই শুরু করা যাক!

রবিনের মাথায় জগ থেকে পানি ঢেলে দিলাম আর পকেট থেকে স্মেলিং সল্টের একটা প্যাকেট খুলে ওর নাকে ধরলাম। কিছুক্ষনের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসল। দুই গালে দুইটা কষে থাপ্পর দিলাম যেন সাথে সাথেই বাস্তবতার মর্ত্যে ফিরে আসে। চোখ খুলে হতভম্ব হয়ে একবার শীমুর দিকে আরেক বার আমার দিকে তাকাচ্ছে। মাথা ফেটে লালরক্ত গড়িয়ে পড়ছে। পাত্তা দিলাম না। এর চেয়ে অনেক বেশ রক্তক্ষরণ হয়েছে আমার বুকে। ছেলেটার পাশে আরেকটা চেয়ার নিয়ে বসলাম।
-আমার নাম শোয়েব। তোমার সামনে বসা মেয়েটার স্বামী। এই মেয়েকে আমি সাত মাস আগে বিয়ে করেছি। তুমি সেটা জান, খুব ভালো করে জান। কিন্তু জানার পরও এই মেয়ের সাথে দিনের পর দিন অবৈধভাবে শারীরিক সম্পর্ক করে বেড়িয়েছ। আজকে এই জঘন্য পাপের উপযুক্ত শাস্তি তোমাকে দেয়া হবে। কথা দিচ্ছি, প্রতিটা মুহুর্তে তুমি অনুভব করবে কি ভূল তুমি করেছ!

চেয়ার থেকে উঠে আমি রবিনের পিছনে যেয়ে দাড়ালাম। ওর গায়ের শার্ট আর প্যান্ট আমি আগেই ছিড়ে ফেলেছি। সব কিছু আজকে প্ল্যান মাফিক হবে। ছুড়িটা বের করে শীমুর দিকে তাকালাম।
-শীমু, দেখ এই হাত দুইটা দিয়ে ও তোমাকে জড়িয়ে ধরত তাইনা, দেখ, ভালো করে দেখ, আমি এই গুলিকে কি শাস্তি দেই!

রবিনের দুইহাত চেয়ারের হাতলের সাথে লম্বা করে বেঁধে রেখেছিলাম। এবার ছুরি দিয়ে কব্জি থেকে কনুই পর্যন্ত লম্বা করে গভীর ভাবে কেটে দিলাম। রগ কাটালাম না। একে আমি বাঁচিয়ে রাখতে চাই আরও অনেকক্ষন। গল গল করে রক্ত পড়ছে হাত দুইটা থেকে। রবিন পাগলের মতো চেস্টা করছে ছুটার জন্য। কোন লাভ নেই। সব দড়ি গুলিও আমি ফৌজদার হাটের জাহাজ ভাঙ্গা জিনিস বিক্রির দোকান থেকে ছুড়ি আর হ্যামারের সাথে কিনেছিলাম। এইগুলি দিয়ে জাহাজ বাঁধে আর এতো মাত্র একটা সামান্য মানুষ!

শীমু আপ্রান চেস্টা করছে উঠে দাঁড়ানোর। কোন লাভ নেই। কি যেন বলতে চেস্টা করছে, ইচ্ছে করছে না আর কিছু নতুন শুনতে।
-শীমু তুমি আমাকে আন্দাজে নপুংশক বলেছিলে। আজকে আমি তোমাকে দেখাব কাকে নপুংশক বলে? আশা করি আর কোন দিনও এটা নিয়ে ভূল করবে না।

ছুরিটি হাতে নিয়ে রবিনের সামনে যেয়ে নীচু হলাম আমি। শীমু প্রবল বেগে দুই পাশে মাথা নাড়ছে।
-তোমাদের প্রতারণা মহাকাব্যের আজকে এখানেই পরিসমাপ্তি ঘটবে!

কাজটা শেষ করে আমি মেঝেতে যেটা ফেলে দিলাম, সেটা দেখার সাথে সাথেই শীমু জ্ঞান হারাল। আর রবিনও নিস্তেজ হয়ে গেল। হাতে বেশি সময় নেই। শীমুর মাথায় আবার পানি ঢেলে দিতেই জ্ঞান ফিরে আসল। দারুন, আবার কাজ শুরু করা যাক!

আজকে সব কথা শুধুই আমার। আবার শীমুর দিকে তাকিয়ে বললাম-
-শীমু, দেখ আমি কি করছি? এটা হচ্ছে রবিনের পাঁজরের হাড়। এর ঠিক নীচেই ওর হৃদপিণ্ড ধুক ধুক করছে। একদিন ফোনে বলেছিলে না, ওর বুকে মাথা রেখে এই হৃদপিণ্ডের ধুক ধুক শুনতে তোমার খুব ভালো লাগে!

আমি বাম হাত দিয়ে রবিনের বাম বুকের পাঁজরের হাড় গুলি মধ্যে সেই গ্যাপটা বের করলাম যেটা দিয়ে হৃদপিণ্ড স্পর্শ করা যাবে। তারপর হাসি মুখে সেই ধার করা ছুরিটা ঠিক ঠিক মাপ মতো ঢুকিয়ে দিলাম। বেশি ঢুকালে সাথে সাথেই মারা যাব। ছুরির পাশ দিয়ে লালরক্ত ফিনকি দিয়ে পড়ছে। শীমুর ভালোবাসার লাল ধুক ধুক। শীমু আর সহ্য করতে পারল না। পাগলের মতো ছুটার চেস্টা করতে লাগল। চরম বিরক্ত হলাম আমি। যার জন্য এত বিনোদনের ব্যবস্থা করলাম, সেই এত অস্থির হলে হবে?

ছেলেটারও হাতে বেশি সময় নেই, একবারে চলে যাবার আগে আবার ছেলেটার পিছনে যেয়ে দাড়ালাম। আহ, শীমুকে দেখতে এখন কত যে মধুর লাগছে! সবচেয়ে ভালো লাগছে ওর মুখের অভিব্যক্তি গুলি!
-শীমু, এই পৃথিবীতে প্রত্যেকটা জিনিসের একটা এক্সপায়ার ডেট থাকে। অতিরিক্ত পাপের জন্য এই ছেলের ডেটও এক্সপায়ার করে গেছে। I am so so sorry for you!

শীমুর বিস্ফোরিত দুই চোখের সামনেই আমি ছেলেটার চুল ধরে মাথাটা উঁচু করে ধরলাম। তারপর আমার জীবনের সব চেয়ে সেরা হাসিটা দিয়ে রবিনের গলায় আস্তে একটা পোঁচ দিলাম। ধার খুবই ভালো হয়েছে। সাথে সাথেই কেটে রক্ত পড়া শুরু হলো। তারপর ঈদ উল আযহার সময় যেভাবে গরু খাসির গলা কাটে, ঠিক সেই ভাবে ছুরির ঘন ঘন পোঁচ দিয়ে শ্বাসনালীটা কেটে ফেললাম, সাথে মনে হয় আরও কিছু কাটল, কি যায় আসে তাতে? গল গল করে রক্ত বের হয়ে সামনের সব কিছু ভিজিয়ে ফেলেছে। চরম পরিতৃপ্তি নিয়ে তাকিয়ে দেখলাম কেস ফিনিস তবে শীমু আবার সেন্সলেস। এটা কিছু হলো? এখনও কত কাজ বাকি?

সাত
আমি নিজেও যথেষ্টই উত্তেজিত। নিজেকে শান্ত করা দরকার। বাথরুমে যেয়ে ভালো করে হাত মুখ ধুয়ে এসে শীমুর সামনে চেয়ার নিয়ে বসলাম। আয়েশ করে একটা বেনসন ধরালাম। পর পর তিনটা সিগারেট শেষ করার পর শীমুর আবার জ্ঞান ফিরে আসল। পুরোপুরি জ্ঞান ফেরার আগেই ওর মুখের বাধন আমি খুলে দিলাম।

উদভ্রান্তের দৃস্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে শীমু। প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে খুব পছন্দের একটা বাংলা গান ছেড়ে দিলাম। খেয়া আর তাওসিফের, আমার সোনা জান পাখি।

আমার সোনা জান পাখি
তোমায় ছাড়া না বাঁচি মরি

চোখে চোখে রেখে হৃদয়েরই ঘরে
বন্দি তোমাকে বানাবই
আর কত জ্বালাবে মোমের মত করে
এক দিন নিভে যাবোই আমি
চোখে চোখ রেখে দেখনা খুঁজে
পাবে কি ভালোবাসা এমনই……

এই গানটা নিয়ে আমার আর শীমুর খুব চমৎকার একটা স্মৃতি আছে। হানিমুনে যেয়ে একদিন পরে সী বিচে সকাল বেলা দুইজন হাত ধরাধরি করে হাটঁছিলাম। এই গানটা আমার খুব প্রিয়। শীমুর হাতটা ধরে হাঁটছিলাম আর এই গানটা গাইছিলাম আমি। গানটা শেষ হলে শীমু সামনে এসে দাঁড়িয়ে আমাকে বলেছিল, আজকে থেকে আমিই শুধু তোমার সোনা জান পাখি। সাথে সাথেই আমি ওকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। এই স্মৃতির কথা আমাদের দুই জনেরই খুব ভালো করে মনে আছে। শীমু গানটা মাথা নীচু করে শুনল। আমি হাত দিয়ে ওর মুখটা যখন উঁচু করে ধরলাম, তখন দেখলাম ওর দুই চোখে একরাশ লজ্জা এসে জমেছে।
-আমাকে মাপ করে দাও, শোয়েব। আমি ভূল করেছি।

আবার ওর মুখে ভূল করেছি শুনে মনে পড়ে গেল, এই গত তিন মাস ফোনে আমাকে নিয়ে কত শত জঘন্য কথা গুলি ও বলেছে। অসম্ভব, এটা ভূল না।
প্রচন্ড জিদ এসে আবার আমার মাথায় ভর করল। উঠে যেয়ে ছুরিটা নিয়ে আসলাম। নীচু হয়ে শীমুর দুই পায়ের রগ দুইটা কেটে দিলাম। দুই পা থেকে লালরক্ত গড়িয়ে পড়ছে। উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাতেরও রগ কেটে দিলাম। আমার হাতে আর সামান্য সময় আছে। শীমু প্রায় নিস্তেজ হয়ে আসছে। চেয়ারটা ঘুরিয়ে এক হাত তফাতে শীমুর মুখামুখি বসলাম। আমি যে ভয়ংকর কষ্ট পেয়েছি সেটার কিছুটা হলেও উপলব্ধি করুক শীমু।

-আমি তোমাকে প্রচন্ড ভালোবাসি শীমু। আমার বুক ভরা ভালোবাসা শুধুই তোমাকে দিতে চেয়েছিলাম আর বিনিময়ে চলে যাবার আগে পেলাম শুধুই অতৃপ্তি আর হাহাকার। আমার যদি সাতটা জীবন থাকত, এই প্রত্যেকটা জীবনে শুধু তোমাকেই চাইতাম আমি। তুমি ছাড়া এই জীবনের কোন মূল্যই নেই আমার কাছে।

হাসি মুখে গায়ের শার্ট খুলে শীমুর দিকে তাকিয়ে ছুরিটা উঁচু করে বাম বুকের পাঁজরের হাড় গুলি মধ্যে সেই গ্যাপটা বরাবর তাক করে কাছে নিয়ে আসলাম। শীমু পাগলের মতো ছুটে আমার কাছে আসার চেস্টা করতে করতে বলল-
-শোয়েব, না প্লীজ না। তুমি এই কাজ করো না। পাপ আমি করেছি, সমস্ত শাস্তি আজ আমার পাওনা। তুমি কেন নিজেকে শেষ করে দিচ্ছ? তোমার তো কোন দোষ নেই!
-তোমাকে ভালোবাসা দিয়ে আমি নিজের কাছে বেঁধে রাখতে পারি নি। এটাই আমার অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি আমাকে পেতেই হবে…..

শীমুর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে ছুরিটা আস্তে আস্তে ঢুকিয়ে দিলাম। অবাক হলাম, কোন ব্যথা লাগছে না। পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া হৃদয়ের কষ্টের কাছে এটা কোন কষ্টই না!

শীমু ওর জীবনের সব শক্তি এক জায়গা করে শেষ একটা চিৎকার দিয়ে উঠল-
-শোয়েব…না………….


এই সিরিজের আগের পর্ব পড়ে আসুন এখান থেকে গল্প - শইল্যের জ্বালা বড় জ্বালা রে!

উৎর্সগ: ব্লগার তারেক ফাহিমকে Click This Link তার ব্লগে ২য় জন্মদিন উপলক্ষে। উনি আমার সব গল্পের একজন গুনমুগ্ধ পাঠক, প্রায় প্রতিটা গল্পেই উনার চমৎকার মন্তব্য আমাকে মুগ্ধতার আবেশে অনেক দিন পর্যন্ত জড়িয়ে রাখে..........

শুভ নববর্ষ! সবাইকে ধন্যবাদ ও শুভ কামনা রইল।
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত @ নীল আকাশ, ডিসেম্বর, ২০১৮


আমার কাছে ভালোবাসার মাত্র তিনটা মৌলিক রং। প্রথম রং- সবুজ, যার স্নিগ্ধতা আর সজীবতা নিয়ে লিখেছিলাম পরিণয়!গল্প Click This Link । দ্বিতীয় রং- লাল; প্রতারণা আর প্রবঞ্চনার, যেটা নিয়ে লিখলাম এই গল্প। তৃতীয় রং- নীল; বিরহ, বিচ্ছেদ আর বেদনার। ইচ্ছে আছে নীল রং নিয়ে লেখার………

সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০১৯ সকাল ১০:৩৪
৫০টি মন্তব্য ৫২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বেলফোর রোড টু কাশ্মীর ! : সভ্যতার ব্লাকহোলে সত্য, বিবেক, মানবতা!

লিখেছেন বিদ্রোহী ভৃগু, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১:৪০

ফিলিস্তিন আর কাশ্মীর! যেন আয়নার একই পিঠ!
একটার ভাগ্য নিধ্যারিত হয়েছিল একশ বছর আগে ১৯১৭ সালে; আর অন্যটি অতি সম্প্রতি ২০১৯ এ!
বর্তমানকে বুঝতেই তাই অতীতের সিড়িঘরে উঁকি দেয়া। পুরানো পত্রিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

চামড়ার মূল্য- মানুষ ভার্সেস গরু

লিখেছেন কাওসার চৌধুরী, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৩:৪৪


২০১০ সালের কথা; তখন পূর্ব লন্ডনের ক্যানরি ওয়ার্ফ (Canory Wharf) এর একটি বাসায় ক্লাস নাইনে পড়া একটি ছাত্রীকে ম্যাথমেটিকস্ পড়াতাম। মেয়েটির আঙ্কেল সময়-সুযোগ পেলে আমার সাথে গল্পগুজব করতেন। একদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দাদীজান ও হ্যাজাক লাইট

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:০০



সময় ১৯৮০ এর দশক, প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসের শেষ শুক্রবার আমার দাদাজানের মৃত্যুবার্ষিকী’তে বড় চাচা, আব্বা বেশ খরচ করে গ্রামবাসী ও আত্মীয় পরিজনদের খাবারের একটা ব্যাবস্থা করতেন, বড় চাচা আর আব্বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গত কিছু সময়ে সামুতে যা যা হয়েছে, ব্লগারদের ওপর দিয়ে যা গিয়েছে, সেসকল কিছু স্টেজ বাই স্টেজ বর্ণনা!

লিখেছেন সামু পাগলা০০৭, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:১৪



কনফিউশন: ধুর! কি হলো! ব্লগে কেন ঢুকতে পারছিনা? কোন সমস্যা হয়েছে মনে হয়, পরের বেলায় চেক করে যাব। বেলার পর বেলা পার হলো, সামুতে ঢোকা যাচ্ছে না! কি সমস্যা!... ...বাকিটুকু পড়ুন

আড্ডাঘরের বর্ণনা

লিখেছেন আনমোনা, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ১০:৩৩

সামু ব্লগে ছিলো এক সামুর পাগল
সারাদিন করে সে যে মহা হট্টোগোল। ।
খুলিলো আড্ডাবাড়ি আড্ডারি তরে।
জুটিলো পাগল দল তাড়াতাড়ি করে। ।
সরদার হেনাভাই, তার এক হবি।
প্রতিদিন আপলোডে মজাদার ছবি। ।
সকল পাগলে তিনি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×