somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এটা মানুষ নাকি রাক্ষস?

১৪ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রিয় পাঠক, আজ আপনাদের সামনে এমন এক ব্যক্তির গল্প তুলে ধরব, যার কীর্তিকলাপ শুনে আপনি নিজেকে প্রশ্ন করবেন — এটা আসলেই মানুষ, নাকি পৌরাণিক কোনো রাক্ষস? না, এটা কোনো রূপকথা নয়। এ এক জীবন্ত বাস্তবতা। একবার ভাবুন তো, আপনি কতগুলো বাড়ি কিনতে চান? একটা? দুটো? হয়তো তিনটে, যদি খুব বড়লোক হন?

আমাদের নায়ক জাবেদ সাহেব একটু অন্যরকম স্বপ্ন দেখেন। তিনি ভাবলেন, "আরে বাবা, একটা-দুটোয় কি হবে? কম করে হলেও আটটা দেশে ২৯৭টা বাড়ি থাকা চাই!" আর সেই সাথে ৩০টা অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট তো বোনাস ! শুধু কম্বোডিয়াতেই ১১৭টা বাড়ি। মানে, কম্বোডিয়ার যদি প্রতিটা বাড়িতে একদিন করেও থাকতে চান, তাহলে চার মাস লেগে যাবে শুধু সেই একটা দেশেই! দুবাইতে ৫৯টা, মালয়েশিয়ায় ৪৭টা, আমেরিকায় ৪০টা। থাইল্যান্ড, ভারত, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম : কোথায় নেই তার সাম্রাজ্য?

সাধারণ মানুষ একটা ফ্ল্যাট কিনতে সারাজীবন ঋণের বোঝা বয়ে বেড়ায়। আর জাবেদ সাহেব? তিনি তো আন্তর্জাতিক রিয়েল এস্টেট মোগল! এবার একটু হিসাব করি। ৬২০টা বাড়ি, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। এর সাথে যোগ করুন ৮টা প্রতিষ্ঠান যার মূল্য আরও ২ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। দেশেও আছে ৯৫৭ বিঘা জমি। ওহ, ভুলেই গিয়েছিলাম! আরও আছে ৪ কোটি ৬৪ লাখ শেয়ার। এবং আমেরিকায় বিনিয়োগ করা এক কোটি ডলার। টাকায় কত হয় জানেন? প্রায় ১১৮ কোটি টাকা ! রূপকথার গল্পেও এত সম্পদের কথা শোনা যায় না।

আগের যুগে ডাকাতরা বন্দুক নিয়ে ব্যাংকে ঢুকত। আধুনিক যুগে? স্ত্রীকে ব্যাংকের চেয়ারম্যান বানিয়ে দিন, তারপর নিজে পর্দার আড়াল থেকে চালান। জাবেদ সাহেব ইউসিবি ব্যাংক থেকে ২৫ কোটি টাকা ঋণ নিলেন। এমনিতে ঋণ নিতে হলে অনেক কাগজপত্র, জামানত, আর কত কী লাগে! কিন্তু যখন নিজেই মালিক, তখন কেন এত ঝামেলা? ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তেই ১৭টি নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছিল। কিন্তু কে শোনে কার কথা! ঋণ মঞ্জুর হয়ে গেল। আর সেই টাকা? হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে সোজা বিদেশে !

যে ব্যাংকে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ছিল, সেটা এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে। কিন্তু জাবেদ সাহেবের কী আসে যায়? তিনি তো লন্ডনে বসে আরাম করছেন! ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আল জাজিরা একটা তথ্যচিত্র বানাল : "মন্ত্রীর কোটি কোটি ডলার"। আন্তর্জাতিক মিডিয়া যখন খোঁজখবর নেয়, তখন আর লুকানো যায় না। আরও মজার ব্যাপার হলো, জাবেদ সাহেব নির্বাচনী হলফনামায় বিদেশের এই বিশাল সম্পদের কথা একটি শব্দও উল্লেখ করেননি! মানে, আপনি-আমি যদি ১০ হাজার টাকা আয় গোপন করি, তাহলে আইনে ধরা খাই। আর হাজার হাজার কোটি টাকা গোপন করলে? সেটা তো নেতৃত্বের কৌশল!

এরপর যখন তদন্ত শুরু হলো, গাড়িচালকের বাড়ি থেকে উদ্ধার হলো ২৩ বস্তা নথিপত্র। বিদেশের সম্পদ আর ঋণের সব হিসাব। ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর জাবেদ সাহেব এখন যুক্তরাজ্যে। নিরাপদ দূরত্বে। বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে ৩৬ জনের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। ইন্টারপোলের রেড নোটিশেরও আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু চিন্তা নেই! আটটা দেশে এত বাড়ি থাকলে পলাতক জীবনও তো আরামদায়ক হবে। একেক দিন একেক দেশে থাকবেন। একঘেয়েমি হওয়ার সুযোগই নেই !

এবার আসি আসল প্রশ্নে। এটা কি মানুষ নাকি রাক্ষস? পৌরাণিক কাহিনীতে রাক্ষসদের বর্ণনা পাওয়া যায় — তারা নাকি নির্দয়, লোভী, আর সাধারণ মানুষের রক্ত শোষণ করে। তারা গুপ্তধন লুকিয়ে রাখে পাহাড়ের গুহায়, সমুদ্রের তলায়। জাবেদ সাহেব? তিনি গুপ্তধন লুকিয়ে রেখেছেন কম্বোডিয়ায়, দুবাইতে, মালয়েশিয়ায়। তিনি সাধারণ মানুষের সঞ্চয় শুষে নিয়েছেন ব্যাংক ডাকাতির মাধ্যমে।

এই গল্প শুনে আমরা হাসি, কাঁদি, রাগ করি। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো : এই ব্যবস্থা কীভাবে এত বছর টিকে ছিল? কেন কেউ প্রশ্ন করেনি? কীভাবে একজন মানুষ এত সম্পদ গড়ল, আর কেউ টের পেল না? হয়তো উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের নিজেদের মধ্যেই। কারণ একজন জাবেদ একা এত বড় সাম্রাজ্য গড়তে পারে না। তার সঙ্গী ছিল আমাদের নীরবতা, আমাদের উদাসীনতা, আমাদের "চলে যাক" মনোভাব।

সমকাল : https://www.ittefaq.com.bd/770208

সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৪১
১২টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুভি "হক" : ডিভোর্সীর হক আবার কি জিনিস, খায় না মাথায় দেয়! :P

লিখেছেন সোহানী, ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৪৫



একটা ঘটনা শেয়ার করি। আমার কলিগ মারিয়া, মধ্য বয়সী সিঙ্গেল মাদার। চৈাদ্দ ও সাত বছরের দু'টো বাচ্চা তাঁর। স্কুল জীবনের সুইটহার্টের সাথে পনেরো বছর সংসার করার পর ডিভোর্সের পর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মা ও খোকার রাজ্যপাট

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৪১


নদীর তীরে কাশের বন সেথায় ছোট্ট কুঁড়েঘর,
আমি থাকি মা-ও থাকে আর কেউ নেই আপন-পর।

ঘরের পাশে বাঁশের বন তার ওপারে সুদূর মাঠ
সেই মাঠেতে কাটে দিন সভা-সদ বিহীন রাজ্যপাট।

শান্ত শীতল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগাররা সব কোথায় গেল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৩১

ব্লগাররা সব কোথায় গেল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ব্লগাররা সব কোথায় গেল, ব্লগটা কেন শূণ্য?
কে বলেছে এমন কথা, ব্লগ লেখায় নাই পূণ্য?

ব্লগাররা সব কোথায় গেল, ব্লগটা রেখে খালি?
শূন্য কেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

উগ্র মতাদর্শ বৃদ্ধির বিপদ আমরা বুঝতে পারছি?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৪৪


আড়াই দশক ধরে আমরা একটা জোয়ার দেখছি। নীরবে, ধীরে ধীরে উঠে আসা এক জোয়ার। ধর্মীয় উগ্রপন্থার জোয়ার। কখনো গোচরে, কখনো অগোচরে। রাজনীতির মঞ্চে, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে, ফেসবুকের টাইমলাইনে, প্রবাসে বসা... ...বাকিটুকু পড়ুন

এটা মানুষ নাকি রাক্ষস?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৪ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৩৯


প্রিয় পাঠক, আজ আপনাদের সামনে এমন এক ব্যক্তির গল্প তুলে ধরব, যার কীর্তিকলাপ শুনে আপনি নিজেকে প্রশ্ন করবেন — এটা আসলেই মানুষ, নাকি পৌরাণিক কোনো রাক্ষস? না, এটা কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×