somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নেপালকে বাংলাদেশ হতে দিতে চান না সুশীলা কারকি !

১৫ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


নেপালের ইন্টেরিম সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সুশীলা কারকি সম্প্রতি একটি বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসেছেন। তিনি বলেছেন, নেপালের পরিস্থিতি যেন বাংলাদেশের মতো না হয়, সে ব্যাপারে তিনি সতর্ক থাকবেন। এই কথা শুনে একটি নিষিদ্ধ দলের সদস্যরা এমনভাবে উল্লাস প্রকাশ করছে যেন তারা লটারির জ্যাকপট জিতে ফেলেছে। তাদের মুখে একটাই কথা, "দেখলেন তো, আগেই ভালো ছিলাম!" কিন্তু বাস্তবতা হলো, সুশীলা কারকি যে কথাটা আসলে বোঝাতে চেয়েছেন, সেটা তাদের মাথার অনেক উপর দিয়ে চলে গেছে।

সুশীলা কারকির আসল অভিযোগটা একদম অন্য জায়গায়। বাংলাদেশের ইন্টেরিম সরকার ক্ষমতায় বসার পর থেকে যেসব চাপ, হুমকি, দাবি-দাওয়া, আন্দোলন আর রাস্তা অবরোধের মহোৎসব চলেছে, নেপালের জেন-জি এবং রাজনৈতিক দলগুলোও একই পথে হাঁটা শুরু করেছে। সুশীলা কারকি ক্ষমতায় বসেই ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন, মার্চ মাসে নির্বাচন হবে। মানে পরিষ্কার কথা, তার দায়িত্ব হলো রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত রাখা আর আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু না, এদিকে মানুষ ভাবছে, ইন্টেরিম সরকার মানে হলো একটা সুপারমার্কেট যেখানে গিয়ে যে যার মনের মতো দাবি-দাওয়া তুলে নিয়ে আসবে। আর সুশীলা কারকি সেই ক্যাশিয়ার যিনি সব মেনে নেবেন হাসিমুখে।

বাংলাদেশের গল্পটা শুনলে আপনার মাথা ঘুরে যাবে। জুলাই আন্দোলনের পর থেকে কমপক্ষে ১৫০টির বেশি আন্দোলন হয়েছে। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন, ১৫০টি! মনে হচ্ছে আন্দোলন করাটা একটা জাতীয় খেলায় পরিণত হয়ে গেছে। ঢাকার মতো জায়গায় আজকের দিনেও অবরোধ করে আন্দোলন করা হয়েছে। মানুষের জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করা হয়েছে। কেউ অফিসে যেতে পারেনি, কেউ হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেনি, কেউবা পরীক্ষা দিতে দেরি হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের কাছে এসব কোনো ব্যাপার না। তাদের কাছে দাবি আদায় করাটাই একমাত্র লক্ষ্য, বাকিরা পথে বসে থাকুক বা দাঁড়িয়ে থাকুক, সেটা তাদের চিন্তার বিষয় নয়।

গত দেড় বছরে এরকম অযৌক্তিক অসংখ্য আন্দোলন করে ইন্টেরিম সরকারকে এক প্রকার জিম্মি করে সবাই নিজ নিজ দাবি আদায় করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। শুরুটা করেছিল ২০২৪ সালের ইন্টার পরীক্ষার প্রার্থীরা। মাত্র চারশত জন একত্র হয়ে মব করে শিক্ষা উপদেষ্টাকে জিম্মি করে অটোপাস করার দাবি আদায় করে নিয়েছে। ভাবুন তো, পরীক্ষা না দিয়েই পাস করার দাবি ! বাংলাদেশে এর আগে এমন জঘন্য ঘটনা ঘটতে দেখা যায়নি। কিন্তু একবার এই নজির সৃষ্টি হয়ে গেলে, বাকিরা বুঝে গেল যে এই খেলায় জেতা খুব সহজ।

ইন্টেরিম সরকার যেহেতু ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ভিত্তিতে ক্ষমতায় এসেছে, তাই ছাত্রদের প্রতি তারা সর্বোচ্চ নমনীয়তা দেখিয়েছে। কিন্তু এই নমনীয়তাটা হয়ে গেল একটা আমন্ত্রণপত্র। কতিপয় বিপথগামী ছাত্র মিলে বারবার রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। এরপর শুরু হলো এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা। আনসার আন্দোলন হলো। কবি নজরুল কলেজ আর মাহবুবুর রহমান কলেজের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হলো। ঢাকা সিটি কলেজ, ঢাকা কলেজ, ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা একাধিকবার সংঘাতে লিপ্ত হলো। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি আর সিটি ইউনিভার্সিটির মধ্যে মারামারি হলো। মনে হচ্ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পড়াশোনার জায়গা নয়, বরং একেকটা যুদ্ধক্ষেত্র। সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কেউ আর বুঝতে পারছে না যে কোনটা ন্যায্য দাবি আর কোনটা নিছক সুবিধা আদায়ের কৌশল।

সবচেয়ে বেশি মাথাব্যথা হয়েছে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি করার নামে বারবার আন্দোলন করে সরকারের উপর চাপ বাড়ানোর ঘটনাগুলো নিয়ে। সবাই যেন একটা পণ নিয়ে মাঠে নেমেছিল যে দুর্বল ইন্টেরিম সরকারের কাছ থেকে যা পারা যায় আদায় করে নিতে হবে। এটা অনেকটা এমন যে, আপনার বাড়িতে একজন অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক এসেছেন কিছুদিনের জন্য, আর আপনি ভাবছেন, "এই সুযোগে নতুন গাড়ি, নতুন টিভি, নতুন ফ্রিজ সব কিনিয়ে নেই, কারণ আসল মালিক আসলে তো আর কিনে দেবে না!"

এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃশ্যমানভাবে উন্নত না হওয়ায় সমাজে নিরাপত্তাহীনতা আর বিশৃঙ্খলা বেড়ে গিয়েছে। এর মাঝে যদি প্রতিদিন আন্দোলন হতে থাকে, তাহলে সরকার কী করবে? তারা কি শুধু আন্দোলনকারীদের দাবি শুনতে শুনতেই সময় কাটাবে, নাকি দেশ চালানোর কিছু কাজও করবে? আন্দোলনকারীদের প্রতিটি গ্রুপের মানসিকতা ছিল একদম পরিষ্কার, "ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার এসব দাবি মানবে না, তাই এখনই চাপ দিয়ে ইন্টেরিম সরকার থেকে যা পারা যায় আদায় করে নিতে হবে।" এমনকি শিক্ষকেরা পর্যন্ত আন্দোলন করে সরকার থেকে সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন। শিক্ষকরা! যারা শিক্ষার্থীদের শেখান নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য আর সঠিক পথে চলার শিক্ষা। তারাও রাস্তায় নেমে গেলেন দাবি-দাওয়া নিয়ে।

এভাবে ইন্টেরিম সরকারকে চাপ দিয়ে যেসব দাবি-দাওয়া আদায় করা হয়েছে, সেগুলো নির্বাচিত সরকার মেনে নেবে কিনা সেটা বড় প্রশ্ন। কারণ নির্বাচিত সরকার যখন আসবে, তখন তারা সার্বিক দেশের পরিস্থিতির কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেবে, কোনো একটা গ্রুপের চাপে নয়। তখন হয়তো অনেক দাবিই বাতিল হয়ে যাবে, কারণ সেগুলো অযৌক্তিক বা রাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে। তখন এই আন্দোলনকারীরা আবার রাস্তায় নামবে, আবার চাপ দেবে, কিন্তু নির্বাচিত সরকার ইন্টেরিম সরকারের মতো নমনীয় হবে না। কারণ তাদের জনগণের কাছে জবাবদিহিতা আছে, একটা নির্দিষ্ট গ্রুপের কাছে নয়।

এভাবেই দিনের পর দিন আন্দোলন করে ইন্টেরিম সরকারকে রীতিমতো নাভিশ্বাস তুলে ফেলা হয়েছে। নেপালের প্রধান উপদেষ্টা সুশীলা কারকি ঠিক এই পরিস্থিতির কথাই ভেবে ভয় পাচ্ছেন। তিনি দেখছেন যে তার উপরেও নানা ধরনের অযৌক্তিক চাপ আসছে। তিনি প্রচণ্ড রাগান্বিত হয়েছেন এই ভেবে যে, মার্চ মাসেই তো নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসবে। তখন যার যার ন্যায্য দাবি সেই সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হোক। কিন্তু সেটা না করে যে কোনো ছুতা পেলেই রাস্তায় নামার কী দরকার? এটা তার কাছে বোধগম্য হচ্ছে না। তিনি এটিকে দেশকে অস্থিতিশীল করার একটা সুপরিকল্পিত চক্রান্ত হিসেবে দেখছেন। তাই তিনি আরও কঠোর হওয়ার পূর্বাভাস দিচ্ছেন।

আসলে গোটা ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায়। সবাই ভাবছে, ইন্টেরিম সরকার মানে হলো একটা সীমিত সময়ের অফার সেল, যেখানে গিয়ে যা পারা যায় লুটেপুটে নিয়ে আসতে হবে। কেউ ভাবছে না যে এই লুটপাটের ফলে দেশের কী ক্ষতি হচ্ছে, সাধারণ মানুষের কী ক্ষতি হচ্ছে, নাকি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কী অবনতি হচ্ছে। সবাই শুধু নিজের স্বার্থটাই দেখছে। আর এই স্বার্থপরতার খেসারত দিতে হচ্ছে গোটা জাতিকে। সুশীলা কারকি ঠিক এই পরিস্থিতিটাই এড়াতে চান। তিনি চান না যে নেপালও বাংলাদেশের মতো একই ভুলের শিকার হোক।

একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা দেশের এই কঠিন সময়ে নিজেদের নির্লজ্জ দাবি-দাওয়ার বিষয়টা নিয়ে ভাবা উচিত। ইন্টেরিম সরকার কোনো জাদুকর নয় যে হাত ঘুরিয়ে সবার সব দাবি পূরণ করে দেবে। তাদের কাজ হলো দেশকে একটা স্থিতিশীল অবস্থায় রাখা, যাতে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসতে পারে। কিন্তু আমরা যদি প্রতিদিন রাস্তায় নেমে আন্দোলন করি, অবরোধ করি, সংঘর্ষে লিপ্ত হই, তাহলে সেই স্থিতিশীলতা আসবে কীভাবে? নেপালের প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যে ঠিক এই কথাটাই বোঝাতে চেয়েছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, "আমি বাংলাদেশের ভুল থেকে শিখেছি, এবং আমি সেই ভুল আর করব না।"

বি: দ্র : এখানে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক অস্থিরতা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা উহ্য রাখা হয়েছে। সাধারণ নাগরিক হিসাবে দেশের কঠিন সময়ে নিজেদের নির্লজ্জ দাবী দাওয়ার বিষয় টি নিয়ে কেবল আলোচনা করা হয়েছে। নেপালের প্রধান উপদেষ্টা উনার বক্তব্যে এমনটাই ইংগিত করেছেন।

সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৪৬
১১টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

BNP কেও আওয়ামিলীগের মত নিষিদ্ধ করা যায়...

লিখেছেন অপলক , ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:০৩



আমাদের দেশে দারুন কিছু ঘটনা আমরা সাদরে গ্রহন করেছি, যদিও সেগুলো স্পষ্ট অপরাধ।

উদাহরন স্বরুপ:
১. কেউ অবৈধভাবে টাকা ইনকাম করল, সেই কাল টাকা সাদা করার সুবিধা দেওয়া হত, দেয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

অলৌকিক ঘটনায় ভরপুর আল ইসরা ওয়াল মিরাজ - ১ম পর্ব

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:০৯


...................................মহাশুন্যে উর্ধালোকে ভ্রমনের একটি কাল্পনিক বাহন.
পোস্টের শুরুতেই এখানে প্রচ্ছদে থাকা ছবিটি সম্পর্কে বিনয়ের সঙ্গে পরিষ্কার করতে চাই এই ছবিটি কোনো
বাস্তব ঘোড়া বা জীবজন্তুর রূপ হিসেবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

উনার কি এখন নতুন পি,এইচ,ডি করা লাগবে? ;) (সাময়িক)

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৫

সামু যাকে চিরতরে নিষিদ্ধ করেছে, তাঁর কথা বলছি। তিনি আমেরিকান কোন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রযুক্তিবিদ্যায় পিএইচডি করেছেন বলে শুনেছি। অথচ, সেই বিদ্যা এখন কাজে লাগছে না দেখছি!!! সামু'র 'গার্বেজ' সফটওয়্যার... ...বাকিটুকু পড়ুন

=তোকে হলুদ ফুলের শুভেচ্ছা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৩


হিমু,
কেমন আছিস? হলুদ ফুলের শুভেচ্ছা নিস
নিস শিশিরের স্নিগ্ধতা;
নিস কুয়াশার হিম আবেশ, মনে মাখিস
কেমন আছিস? আছিস কোথা?

এন্তার প্রহর গেল পেরিয়ে;
নিচ্ছিস না আর মনের খোঁজ,
কোথায় তুই গেলি হারিয়ে?
তুই কী জানিস, তোকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নেপালকে বাংলাদেশ হতে দিতে চান না সুশীলা কারকি !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:০৫


নেপালের ইন্টেরিম সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সুশীলা কারকি সম্প্রতি একটি বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসেছেন। তিনি বলেছেন, নেপালের পরিস্থিতি যেন বাংলাদেশের মতো না হয়, সে ব্যাপারে তিনি সতর্ক থাকবেন। এই কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×