somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জাদিদ
তুমি আমার রাতবন্দিনী। ধূসর স্বপ্নের অমসৃণ সুউচ্চ দেয়াল তুলে তোমাকে আমি বন্দী করেছি আমার প্রিয় কালোর রাজত্বে। ঘুটঘুটে কালোর এই রাজত্বে কোন আলো নেই। তোমার চোখ থেকে বের হওয়া তীব্র আলো, আমার হৃদয়ে প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টি করে এক অপার্থিব জ্যোৎস্না।

যাপিত জীবন কড়চাঃ আমাদের সহনশীলতার অবক্ষয় এবং একজন সাধকের গল্প।

১১ ই নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ১২:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এই লেখাটা ফেসবুকে প্রকাশ করেছিলাম। ব্লগের বন্ধুদের জন্য এখানেও প্রকাশ করলাম।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের সামাজিক সংস্কৃতিতে একটা বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে অধর্মের চর্চা বেড়েছে, সহনশীলতা কমেছে। দিন শেষে একমাত্র তৃপ্তির জায়গা - সংখ্যা গরিষ্ঠতা। হাজার হাজার মানুষ এই দেশে ধর্মের নামে অন্যরে মারতে রাজি, মরতে রাজি, কিন্তু নীতি নৈতিকতার প্রশ্নে ঠনঠন।


ফলে যখন জানলাম, প্রায় একশ বছর আগে দেশের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনৈক ব্যক্তি মসজিদে বসে একতারা বাজিয়ে গজল গাইতেন তখন অবিশ্বাসের চাইতে বর্তমান সময়ে হলে কি হতো তা ভেবে সারা শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেলো।

আমাদের সময়টা বর্তমানে এতটাই খারাপ যে, এইটুকু পড়ে অনেকেই ধরে নিতে পারেন এই লেখক বুঝি অতি প্রগতিশীলদের একজন, ধর্ম বিরোধী কিংবা নাস্তিক। যারা এমনটা ভাবেন, তারা নিঃসংকোচে জানাবেন। লজ্জা পাবেন না। সবার সবাইকে চেনা উচিত।

যে ভদ্রলোকের কথা বলছি, তাঁর নাম আব্দুল হক আকন্দ। শৈশবকাল থেকেই তিনি বাংলা পড়ালেখার পাশাপাশি ফারসি ও আরবি শিক্ষায় শিক্ষিত হন। পরবর্তীতে তিনি একটি মসজিদে ইমামতি শুরু করেন এবং শিশুদের আরবি শিক্ষা দিতেন। রাতের বেলা অবসরে তিনি গান লিখতেন আর তা সুর করতেন। তিনি যে সকল গান লিখতেন তাতে ধর্ম বর্জিত কিংবা লৌকিকতাবর্জিত কোন কিছু ছিলো না বরং তিনি লিখেছেন যাপিত জীবনের দর্শন, নানা দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনা, সৃষ্টিকর্তার প্রেম এবং জীবন দর্শন নিয়ে।

মসজিদে বসে গান গাওয়া তখন অনেকেই পছন্দ করেন নি। এলাকাবাসী তাঁকে এতটাই শ্রদ্ধা করত যে, অনেকের আপত্তি থাকলেও গান গাওয়ার ব্যাপারে তাঁকে কেউ সরাসরি নিষেধ করার সাহস করে নি। তিনি তার বিরোধী মতের সাথে মেলামেশা করেছেন, তাদের সম্মান দিয়েছেন। তিনি তাঁর বক্তব্য যুক্তিতর্ক দিয়ে প্রমান করতেন। ফলে একসময় তাঁর বিরোধীতা করা অনেক মানুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন, কারন তিনি যা বলেছিলেন, তা তিনি নিজের জীবনেই প্রয়োগ করেছিলেন। তাঁর মধ্যে কোন স্ববিরোধিতা ছিলো না বিধায়, সমাজের অধিকাংশ মানুষ তাঁকে গ্রহণ করেছিলো নিজের হৃদয়ে। হাওরের হাজারো মানুষ হৃদয়ে তিনি এখনও বেঁচে আছেন জীবন ঘনিষ্ঠ সুরে, দর্শনে।

আপনারা হয়ত অনেকেই বুঝেছেন আমি কার কথা বলছি। এই মহান দার্শনিককে আমরা উকিল মুন্সি হিসাবে চিনি। শৈশবে তাঁর বাবা মা চেয়েছিলো তাঁকে উকিল বানাতে। ফলে তাঁকে উকিল বলেই ডাকতেন। মসজিদে ইমামতির সুবাধে তাঁকে মানুষ ডাকত উকিল মুন্সি হিসাবে।

প্রখ্যাত কথা শিল্পী হূমায়ূন আহমেদকে আন্তরিক ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা। তাঁর কল্যানেই মানুষ আজকে এই মহান সাধককে নতুন করে চিনতে পেরেছে আর বারী সিদ্দিকীর তাঁকে কন্ঠে লালন করেছেন।

নিজের প্রাণ প্রিয় স্ত্রীর চির বিদায়ে উকিল মুন্সি লিখেছিলেন -
"তুমি আমি জনম ভরা ছিলাম মাখামাখি, আজি কেন হইলে নীরব মেল দুটি আঁখি রে পাখি, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি, শুয়া চান পাখি আমার "
উল্লেখ্য, শ্রাবণ মেঘের দিন চলচ্চিত্রে এই গানটি ব্যবহার হয়েছিলো। আমাদের চলচ্চিত্র পুরষ্কার কমিটির 'জ্ঞানী বিচারকরা' শ্রেষ্ঠ গীতিকারের পুরুষ্কার দিলেন- উকিল মুন্সীকে। হুমায়ুন আহমেদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো, উকিল মুন্সির ঠিকানা কি? কোথায় পাওয়া যাবে?
হুমায়ূন আহমেদ জবাব দিয়েছিলেন, কবর খুড়লেই পাওয়া যাবার কথা। তবে, দেড়শ বছর পার হয়েছে এটা একটা সমস্যা।
উল্লেখ্য, কোন ছবির মৌলিক গানের জন্য গীতিকারকে পুরুষ্কার দেয়ার নিয়ম আছে। কিন্তু কোন ছবিতে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন বা এই জাতীয় কারো গান ব্যবহার করলে তাদের শ্রেষ্ঠ গীতিকার পুরুষ্কার দেয়া যায় না। উকিল মুন্সি যে একই দলের এটা পুরুষ্কার কমিটি জানতেন না।
এই প্রসঙ্গে হুমায়ুন আহমেদ বলেছিলেন, বাংলাদেশের এই জাতীয় কোন কমিটিতে বেশিরভাগ সদস্য যে মুর্খ থাকবেন, তা নিপাতনে সিদ্ধ।

তবে এই ব্লগার ওয়াহিদ সুজন ভাই এই মহান সাধককে নিয়ে একটি অসামান্য বই রচনা করেছিলেন। সেই বইয়ের সুত্র অনুসারে অবশ্য উপরের গানটি স্ত্রীর বিদায়ে নয় বরং উকিল মুন্সির যার শীর্ষত্ব গ্রহন করেছিলেন, তার মৃত্যুতে তিনি লিখেছিলেন।

যাইহোক, গতকাল মতিঝিল থেকে বাসায় ফিরছিলাম। বেশ রাত হয়ে গিয়েছিলো। আসার সময় ওসমানী উদ্যান দিয়ে আসার সময় অনুভব করলাম, দরজার ঠিক বাইরে শীত মহাশয় দাঁড়িয়ে আছেন। তাছাড়া গাছপালা বেশি থাকাতেও কিছুটা শীতের অনুভব বেশি হচ্ছিলো। হঠাৎ রিকশাওয়ালা এই গানটি গাইতে শুরু করলেন। কি সুন্দর টান আর কন্ঠ!! আমি অদ্ভুত মোহে আচ্ছন্ন। কার্জন হল পার হবার সময় মনে হচ্ছিলো, আমি বুঝি গ্রামীন কোন জনপদের ভেতর দিয়ে হাটছি। বাসায় ফিরে রিকশা ওয়ালাকে দশটাকা বেশি দিলাম সুন্দর এই গানের জন্য। রিকশাওয়ালা অদ্ভুত সুন্দর একটা হাসি দিয়ে অন্য একটা গান গুন গুন করতে করতে চলে গেলো।

সেই থেকে মাথায় উকিল মুন্সি ঘুরছিলো। এই উকিল মুন্সিকে নিয়ে আগেও লিখেছিলাম। আজকে আবারও লিখলাম। উনার ব্যাপারে লিখতে গিয়ে মনটা অদ্ভুত এক মায়া এবং বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে গেলো। কথায়, বলে যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ।

আমাদের মানুষরা অতীতে কতটা সহিষ্ণু ছিলো, কতটা অন্যের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান দিতো সেটা ভেবেই মনটা বিষিয়ে যাচ্ছে।
এই যুগে, এই প্রজন্মে, আধুনিকতা, এই ধর্মভীরুতা আমাদেরকে হিংসা, বিদ্বেষ, নিষ্ঠুরতা ছাড়া আর কি দিয়েছে?

সর্বশেষ এডিট : ১১ ই নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ১২:৪৯
১০টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শীত শুরু হয়েছে, দেখা যাক, কে টিকে থাকে?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২০ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ১০:০৩



**** কেহ ১ জন আমার পোষ্টটাকে রিফ্রেশ করছে; এসব লোকজন কেন যে ব্লগে আসে কে জানে! ****

সেপ্টেম্বর মাসে একটি টিমের সাথে ফুটবল খেলেছি; এই মাসের শেষেদিকে হয়তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাতাস বুঝে ছুইটেন !

লিখেছেন স্প্যানকড, ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ১:৪১

ছবি নেট।

হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেনঃ "মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ, তবে বাঙালির ওপর বিশ্বাস রাখা বিপদজনক! " 

আসলেই তাই! খবরে দেখলাম ইকবাল নামের একজন ব্যক্তি পবিত্র কুরআন মুর্তির কাছে রেখে চলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন ভবঘুরে ইকবাল হোসেন জন্য সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ল

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১০:৩৫



গত বুধবার ভোরে শারদীয় দুর্গাপূজার মহা অষ্টমীর দিন কুমিল্লা শহরের নানুয়া দীঘির উত্তর পাড়ে দর্পণ সংঘের উদ্যোগে আয়োজিত পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন দেখা যায়। ব্যস আর যায় কোথায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি ও আমার পৃথিবী......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১০:৫১

আমি ও আমার পৃথিবী......

আজও খুব ভোরে উঠেছি প্রতিদিনের মতো। আকাশে তখনও আলগোছে লেগে রয়েছে রাত্রির মিহি প্রলেপ। আমার চেনা পাখিরা জেগে ওঠেনি তখনও। মনটা কেমন যেন একটু বিস্বাদে ভরে আছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পেডাগোজিকাল ট্রানজিশন- শিশু শিক্ষনে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কি ধরনের উদ্যোগ নেয়া যায়

লিখেছেন শায়মা, ২১ শে অক্টোবর, ২০২১ বিকাল ৩:৪৪


করোনাকালীন চার দেওয়ালে বন্দী জীবন ও অনলাইনের ক্লাসরুমের মাঝে গত বছর নভেম্বরে BEN Virtual Discussion "শিশুদের নিয়ে সব কথা" একটি টক শো প্রোগ্রাম থেকে ইনভিটেশন এলো।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×