ঢাকা এয়ারপোর্টের সামনে মৃনাল হকের নির্মীয়মান লালন শিষ্পকর্মটি ১৫ অক্টোবর ২০০৮ এর সন্ধ্যায় একদল ধর্মব্যাবসায়ী ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা ভেঙ্গে ফেলে। খবরটা প্রথম দেখি সম্ববত এই ব্লগেই। সেদিন সামুর ঐতিহ্য অনুযায়ী এখানে শুরু হয়ে যায় এক ভার্চুয়াল রায়ট। দিনমান চলতে থাকে চরম কী-বোর্ড বাজী। চলতে থাকে পাল্টা পাল্টি পোষ্টা পুষ্টি। যে যার মত গোষ্ঠি ধর্ম জাত পাত সকল উদ্ধার করে চলেন বিরামহীন! আমি নিজেও ছয় দুগুনে বারো ঘন্টা পরে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নিজস্ব অনুভুতির কিছু ব্লা ব্লা নিয়ে একটা পোষ্ট ছাড়ি। এর পরের কাহিনীত ত সব ব্লগের পাতায় পাতায় ভরে আছে।
দেশে তখন তথাকথিত আর্মি ব্যাক্ড তত্তাবধায়ক সরকার তদের শেষের দুই মাস পার করছেন। ইলেকশন হবে কি হবে না তা নিয়ে টান টান উত্তেজনা। যতই দিন ঘনিয়ে আসছে ততই অবস্থা বেগতিক হবার একটা শংঙ্কা! এর মাঝে পুরাতন কাসুন্দির বোতলটা কে যে আবার ঝাকাইয়া দিল ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মনটায় বিষন্নতায় ভর করল। প্রিয় কবির কবিতা'র কথা মনে হতে থাকে উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ, হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।
কাথা ছিল মন্ট্রিয়ল থেকে শামীম ভাই ফিরলে তাকে নিয়ে খালিদ ভাইয়ের কাছে যাবো, শুরু হবে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ। আমার কেন যেনো মনে হতে লাগল শামীম ভাই সহসা ফিরতে পারবেন না তাই আমি দেশে এসে নিজেই শুরু করে দিয়ে ছিলাম কাজ। শামীম ভাই আসলেই সময় মত ফিরতে পারেন নাই। কিন্তু তখন পর্য্যন্ত আমি বেশ গুছিয়ে ফেলে ছিলাম। শুটিং প্রায় পচাত্তর ভাগ ডান। বাকীর মধ্যে আছে, শহীদুল্লাহ এসোসিয়েটস্ এর শহীদুল্লাহ সাহেব আর কবি রবিউল হুসাইন এর ইন্টারভিউ। তাও সময় মত হয়ে যাবে, কিন্তু চলার পথে গোল বাধল বিমান বন্দরের গোল চক্কর!
খুটিয়ে খুটিয়ে পড়তে লেগে গেলাম মৃনাল হকের লালন কীর্তি ও সেই কীর্তি বিরোধীদের নিয়ে আমাদের এই ব্লগের প্রায় প্রতিটি লেখা ও লেখার কমেন্ট। ভিন্ন ভিন্ন মত অমতের মাঝে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে কিছু চিন্তা চেতনা। আমি সে সব পড়ি আর বিহব্বল হয়ে যাই! এক সময় জোর গলায় অনেক কেই বলতে দেখি এ পর্য্যন্ত এ দেশে যা যা ভাষ্কর্য্য নির্মান হয়েছে হয়েছে আর একটিও যেন না হয় সেই ব্যাবস্থা নিতে হবে। কি কি সব আইডিয়া আর ভাবনা নিয়ে এক একটি কমেন্ট/ ব্লগ আসতে থাকে! অন্যরা আবার তাতে সায় ও দিচ্ছেন। পোষ্ট গুলিতে প্লস মাইনাসের চলে হাড্ডা হাড্ডি লড়াই। সতেরো কোটি মানুষের কয় জনই বা এই ব্লগাব্লগি করে, তবুও মনটা আমার ভীষন ভীষন খারাপ হয়ে গেল। কাউকে কাউকে দেখলাম ঝোলা ভরা যুক্তি আউড়াচ্ছেন, ভাষ্কর্য্য এক আর মূর্তি অরেক। কি কি সব কথাবার্তা! আবারো সূক্ষ অনুভুতির আঘাত লাগালাগি! আমাদের দেশটা এমন হয়ে যাচ্ছে কেন? আমার কান্না পেয়ে গেল।
এই ভাঙ্গাভাঙ্গি'র প্রতিবাদ করতে তাৎক্ষনি ভাবে পথে নামে চারুকলার পোলাপাইন। সেদিন বিকেলে চারুকলার গেটের সামনের রাস্তায় ছাত্ররা ওদের তুলি দিয়ে কি যেনো আঁকবে আমিও সেখানে হাজির, ক্যামেরা ধরে আছি। এক ছাত্র তার তুলি দিয়ে প্রথমেই রাস্তায় লিখল "বাংলাদেশ মানে অপরাজেয় বাংলা" আমার রোমকুপের ভেতর গাথা পশম গুলো সব সোজা হয়ে গেল। হাত নড়ে উঠল, ফ্রেমটা কেঁপে গেল। বাংলাদেশ মানে অপরাজেয় বাংলা। কি দৃপ্ত সেই তুলির টান! খুশিতে আমার চোখ ভীজে ওঠে, নাহ্ তোমার ভয়নেই মা আমরা প্রতিবাদ করতে জানি।
একুশ বছর পর তিন মাস হল দেশে ফিরেছি আমি জানি না এই ক্ষনে ঠিক কোথায় আমাকে যেতে হবে? চারুকলার প্রতিবাদের সাথে ভীড়ে গেলাম। ওদের পিছন পিছন হাটতে থাকি কখনো লেন্সের ক্যাপ খুলে কখনো না খুলে। হাটতে থাকি ওদের গানের মিছিলে, আলোর মিছিলে, পতাকার মিছিলে। জানি না এই সব ফুটেজ দিয়ে কি হবে! অটোয়া থেকে নিয়ে আসা ক্যাছেটের ফিতা ফুরাতে থাকি সচেতন শিল্পী সমাজের কর্মমান্ডর ছবি তুলে তুলে। মাঝে মাঝে সেই সব ফুটেজের কিছু ষ্টিল দিয়ে ছবির ব্লগ লিখি, যে প্লান নিয়ে অপরাজেয় বাংলার কাজ করছিলাম সেটা এক প্রকার থম ধরে গেল। আমি বুঝতে পারছিলাম না তখন কি হবে আর আমারই বা কি করতে হবে!
চারুকলার পোলাপান প্রতি দিন বিকালে ছবির হাট থেকে একটা ভাবের মিছিল বের করে। তার পর তারা এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি গাইতে গাইতে কোন দিন টিএসসি হয়ে ফিরে আসে বকুল তলায় কোন দিন বা অপরাজেয় বাংলার সামনে একটা চক্কর মেরে আসে। এর পর বকুল তলায় ফিরে ধুম ধাম গান বাজনা শুরু করে দেয়। আমি ও টেপের পর টেপ ভরতে থাকি সচেতন শিল্পী সমাজের এই সকল কর্মকান্ডে। পাবলিক খাড়াইয়া খাড়াইয়া কৃষ্ণ কলির গান শুনে, আনুশের গান শুনে বিশ পঞ্চাশ টাকা চারুকলার পোলাপাইনের গামছায় ফেলাইয়া বাদাম চিবাইতে চিবাইতে ফিরা যায়। আমি তখন শাহাবাগ থেকে রাত বিরাতে একলা একলা ক্যামেরা কুমেরা নিয়া কেমনে বাড়ী ফিরব সেই চিন্তা করতে থাকি!
যে ক্যামেরা দিয়ে অপরাজেয় বাংলার ছবি তুলি সেই ক্যামেরাটি আকড়ে ধরে ভয়ে ভয়ে সিএনজি করে প্রতি রাতে বাড়ী ফিরতে ফিরতে ভাবি
এমন দেশটি কোথাও খুজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্ম ভূমী!
এই গানটি কবি কোন সে সপ্নের দেশকে ভেবে লিখে ছিলেন, সে কি আমার এ পোড়া জন্ম ভূমী? এক দিন অবুঝের মত শিখে ছিলাম বলে আজ আর গানের কথা গুলো ভুলতে পারি না, মন থেকে সরাতেও পারি না...
(ছলিবেক)
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ১: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ২: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৩: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৪: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৫: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৬: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৭ : অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৮ : অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৯ : অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ১০ : অপরাজেয় বাংলা
ওয়েব ঠিকানা, অপরাজেয় বাংলা
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মার্চ, ২০১৬ দুপুর ১২:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


