শাহিদা শুকনো পোশাক পরে বাথরুম থেকে বের হল। খুট খুট শব্দ হচ্ছেই। ইতর ফকির। এই শহরে আর বাড়ি ঘর নেই ? মরার জায়গা নেই ? শাহিদা চুল ঝাড়তে ঝাড়তে দরজা খুলে দিল।
‘আজগর আলী কই ?’
শাহিদা চমকে গেল। নুরু মিয়া ! হঠাৎ নুরু মিয়া এল কেন ? শাহিদা গায়ে ওড়না টেনে দিল। বলল, ‘আজগর সাবে তো বাইত নাই।’
‘এক গ্লাস পানি খাওয়া তো।’
শাহিদা পানি নিতে ডাইনিং টেবিলে চলে এল। নুরু মিয়া অনেক দিন বাঁচবে। কিছুক্ষণ আগে ও নুরু মিয়ার কথা ভাবছিল। কিন্তু যে কথা ভেবেছিল, সেটা ভেবে ও লজ্জা পেল।
নুরু মিয়াকে যথেষ্ঠ সমাদর করা উচিত। কারণ আজগর আলীর ফ্ল্যাটে এই কাজ নুরু মিয়াই যুগিয়ে দিয়েছিল। নুরু মিয়া কয়েক মাস আগে তার মাকে এখানে কাজে লাগিয়ে দেয়। কিন্তু মায়ের হাতে অনেক বাড়ির কাজ থাকায় বাধ্য হয়ে তাকে এখানে কাজ করতে হচ্ছে। বলা যায়, সে নিজেই এই ফ্ল্যাটের কাজটা নিয়েছে। তার এই ফ্ল্যাটে কাজ করতে ভালো লাগে। তার আজগর আলীকে ভালো লাগে।
শাহিদা পানি নিয়ে এসে দেখে নুরু মিয়া ড্রয়িং রুমে বসে ভিসিপি দেখছে। সে পানির গ্লাসটা সোফার টেবিলের উপর রাখল। অল্প একটু পানি ছলকে পড়ল টেবিলের গ্লাসের উপর।
‘হুদা পানিই খাওয়াবি ? লগে আর কিছু দিবি না ?’, মজা করে হাসল নুরু মিয়া।
শাহিদা খুব লজ্জা পেল। ও ডাইনিং রুমে চলে এল। সত্যি তো, লোকটাকে ভালো মতো সমাদর করা উচিত। ওর কেন যেন মনে হল, নুরু মিয়াকে ভালো মতো সমাদর না করলে একটা অপরাধ হবে।
ও একটা প্লেটে বিস্কুট ও আরেকটা প্লেটে চানাচুর নিয়ে ড্রয়িং রুমে ফিরে এল। লোকটা মিথুন শ্রীদেবীর নাচ দেখছে। নাচ দেখতে দেখতে মাথা দুলাচ্ছে।
শাহিদা দুটি প্লেট টেবিলের উপর রাখল। খেয়াল করল, লোকটি পানি খায় নি। বলল, ‘পানি খান নাই যে । লন, এইডাই পাইলাম। আমি কি এই বাড়ির মালিক নিহি ?’
নুরু মিয়া ওর দিকে তাকাল। হাসল। বলল, ‘মালিক না হইলেও মালিক হয়া গেছস।’
শাহিদাও হাসল। তৃপ্তির হাসি। সত্যি যদি এ সব কিছু মালিক হওয়া যেত। তাহলে কি খুব মজা হত ?
শাহিদা ঘুরে হাঁটা দিতেই নুরু মিয়া বলল, ‘ কই যাস ? আয়, একটু গপ্পো সপ্পো করি।’
শাহিদা ঘাড় ঘুরিয়ে নুরু মিয়ার দিকে তাকাল। তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে এল। বেরিয়ে এসেই তার মনে হল, কাজটা ঠিক হল না। লোকটার কাছে কিছুক্ষণ বসলে মন্দ হত না।
ও ড্রয়িং রুমে ফিরে এল। নুরু মিয়ার পাশের সোফায় বসল। জিজ্ঞেস করল, ‘চেনাচুর ক্যামোন লাগতাছে ?’
নুরু মিয়া খানিকটা চানাচুর মুখে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, ‘বহুত মচমইচ্যা, কিন্তুক তর মতো না।’
শাহিদা লজ্জা পেল। কিন্তু পর মুহূর্তে কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘আপনে যহন তহন বাজে কতা কন।’
নুরু মিয়া খপ করে শাহিদার একটি হাত ধরে ফেলল, ‘বাজে কতা তো কই। বাজে কাম তো আর করি না।’
‘হাত ছাড়েন’, শাহিদা হাত ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করল, ‘কতা কইবেন বালা কতা , হাত ধরেন ক্যান?’
নুরু মিয়া কাতর স্বরে বলল, ‘ যদি তর মনটা ধরতে পারতাম, তয় হাত ধরন দরকার হইত না। থাউক, তর ওই দামি হাত আর ধরমু না।’
অভিমানী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নুরু মিয়া হাত ছেড়ে দিল। নুরু মিয়ার ছল ছল চোখের দিকে তাকিয়ে শাহিদার খারাপ লাগল। লোকটিকে এভাবে বলা উচিত হয় নি। একটুখানি হাত ধরলে কী এমন ক্ষতি ?
নুরু অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল। এবার তার দিকে তাকাল। তারপর মন খারাপ করা ভঙ্গিতে ছাদের দিকে তাকাল। বলল, ‘তুই তো জানস, আমার ট্যাকার অভাব নাই। গায়ের জোরে আমি সব করতে পারি। আমি বহুত আগে তরে তুইল্যা নিয়া যাইতে পারতাম। করি নাই। কারণ তর উপ্রে আমি জোর করমু না। তুই কবে নিজ ইচ্ছায় আমার কাছে আবি, হের জন্য আমি সারা জীবন অপেক্ষা করমু। ’
শাহিদা অবাক চোখে নুরু মিয়ার দিকে তাকাল। এই কি সেই নুরু মিয়া , যে কথায় কথায় তাকে হুমকি দিত ? শাহিদার বুক কাঁপতে লাগল। এই রকম নরম কথা সে আগে শোনে নি। নুরু মিয়া কি তাকে ভালোবাসে ?
হঠাৎ খেয়াল করল, নুরু মিয়া তার কাঁধে হাত রেখেছে। সে কি হাত সরিয়ে দেবে ? একটুখানি কাঁধে হাত রাখলে কী এমন ক্ষতি ?
নুরু মিয়া বলল, ‘শাহিদা তুই একটু খাড়া। আমি তরে দেহি।’
শাহিদা উঠে দাঁড়াল। ঘোর লাগা চোখে নুরু মিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ নুরু মিয়া তাকে জড়িয়ে ধরল। তার কাঁধের কাছে নুরু মিয়ার উষ্ণ নিঃশ্বাস।
শাহিদা কী করবে বুঝতে পারল না। তার অসম্ভব ভালো লাগছে। অসম্ভব ভালো লাগছে।
চলবে ...
প্রথম পর্ব । দ্বিতীয় পর্ব । তৃতীয় পর্ব । চতুর্থ পর্ব । পঞ্চম পর্ব । ষষ্ঠ পর্ব । সপ্তম পর্ব । অষ্টম পর্ব । নবম পর্ব । দশম পর্ব । একাদশ পর্ব । ত্রয়োদশ পর্ব
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৩ রাত ১২:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



